ব্লাডার ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বলতা (কালার ব্লাইন্ডনেস) বেঁচে থাকার হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে, এমন ফলাফল সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি ২৭৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড বিশ্লেষণ করে করা হয়েছে এবং ফলাফল জানুয়ারি ১৫ তারিখে Nature Health-এ প্রকাশিত হয়।
এই বিশাল ডেটা সেটের মধ্যে ব্লাডার ক্যান্সার রোগী এবং রঙের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক থাকা রোগী দুজনেরই বয়স, লিঙ্গ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সমতুল্য গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছে। মোট ১৩৫ জন রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল রোগী এবং সমান সংখ্যক স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি রোগীর তুলনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষণের ফলাফল দেখায়, রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল রোগীদের মধ্যে মাত্র অর্ধেকই দশ বছর পরেও জীবিত ছিলেন, যেখানে স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি থাকা রোগীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বেঁচে ছিলেন। এই পার্থক্যটি রোগ নির্ণয়ের সময়ের বিলম্বের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে অনুসরণ করা রোগীদের মধ্যে রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বলতা থাকা রোগীরা তুলনামূলকভাবে ৫২ শতাংশ বেশি মৃত্যুর ঝুঁকি বহন করছিলেন। এই উচ্চ ঝুঁকি কোনো ক্যান্সার জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে নয়, বরং রোগের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করার ক্ষমতার ঘাটতির ফলে ঘটছে।
ব্লাডার ক্যান্সারের প্রথম লক্ষণ সাধারণত মূত্রে রক্তের উপস্থিতি, যা প্রায়শই ব্যথা ছাড়া থাকে। রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল রোগীরা লাল রঙকে সঠিকভাবে পার্থক্য করতে না পারায় এই গুরুত্বপূর্ণ সংকেতটি মিস করতে পারেন, ফলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় বিলম্ব হয়। এই বিলম্ব রোগকে অগ্রসর স্তরে পৌঁছাতে পারে, যা চিকিৎসার জটিলতা বাড়ায়।
গবেষণার প্রধান বিশ্লেষক, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োইঞ্জিনিয়ার মুস্তাফা ফাত্তাহ, উল্লেখ করেন যে রঙের দৃষ্টিশক্তি সমস্যার ফলে রোগীর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সীমিত হয়, যা রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, “লাল রঙের সঠিক উপলব্ধি না হওয়াই মূল কারণ।”
এই সমস্যাটি অন্য ক্যান্সার প্রকারে দেখা যায় কিনা তা যাচাই করতে গবেষকরা কলোরেক্টাল ক্যান্সার রোগীদেরও বিশ্লেষণ করেন। এখানে রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বলতা থাকা ১৮৭ জন রোগী এবং একই সংখ্যক স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি রোগীর মধ্যে বেঁচে থাকার হার তুলনা করা হয়। ফলাফল দেখায়, উভয় গোষ্ঠীর বেঁচে থাকার হার প্রায় সমান, কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
ফাত্তাহের মতে, কলোরেক্টাল ক্যান্সার রোগে রঙের দৃষ্টিশক্তি সমস্যার প্রভাব কম দেখা যায় কারণ এই রোগের স্ক্রিনিং প্রোগ্রামগুলো প্রায়ই লক্ষণ প্রকাশের আগে রোগ সনাক্ত করে। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ফলে রোগীর দৃষ্টিশক্তি যাই হোক না কেন, সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
ব্লাডার ক্যান্সার রোগে রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল রোগীদের জন্য এই গবেষণার ফলাফল সতর্কতা হিসেবে কাজ করা উচিত। রোগী ও তাদের পরিবারকে মূত্রে রক্তের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, যদিও রঙের পার্থক্য স্পষ্ট না হলেও। স্বয়ংক্রিয় ইউরিন টেস্ট কিট ব্যবহার বা নিয়মিত ইউরিন বিশ্লেষণ করিয়ে নেওয়া এই ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরাও রোগীর রঙের দৃষ্টিশক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। বিশেষ করে রঙের দৃষ্টিশক্তি সমস্যাযুক্ত রোগীদের জন্য মূত্রের রঙের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ না করলেও, নিয়মিত চেক‑আপের মাধ্যমে রোগের প্রাথমিক ধাপেই সনাক্ত করা সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, রঙের দৃষ্টিশক্তি দুর্বলতা ব্লাডার ক্যান্সার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে হ্রাস করে, যা মূলত রোগের প্রাথমিক লক্ষণ মিস করার ফলে ঘটে। রোগী, পরিবার এবং চিকিৎসক সকলেই এই বিষয়টি মাথায় রেখে যথাযথ সতর্কতা ও স্ক্রিনিং পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
আপনার কি রঙের দৃষ্টিশক্তি সম্পর্কে কোনো সন্দেহ আছে, অথবা মূত্রে রঙের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? সময়মতো ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে নিন।



