চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোট প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ক বিভাগীয় মতবিনিময় সভা ও ইমাম সম্মেলনে আলী রীয়াজ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংবিধান সংশোধনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে, তবে বাস্তবে তা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কার্যকর হয়; এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার।
রীয়াজের মতে, ক্ষমতার ভারসাম্য ছাড়া গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা কঠিন, এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির হাতে কার্যকর কিছু ক্ষমতা প্রদান করা অপরিহার্য। তিনি জোর দেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
সভায় উপস্থিত বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন একত্রে ভোটারদের গণভোটের গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে। রীয়াজ, যিনি গণভোট‑সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচারের প্রধান সমন্বয়ক, উল্লেখ করেন, এই প্রচারণায় কোনো আইনগত বা সাংবিধানিক বাধা নেই এবং বিচারপতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
আসন্ন গণভোটের মূল প্রশ্ন হল, জুলাই মাসে জাতীয় সনদ গ্রহণ করা হবে কি না। রীয়াজ ব্যাখ্যা করেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন করে নতুন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া, এবং একবার ভোট দেওয়া হলে ভবিষ্যতে নির্ধারিত সংস্কারগুলো বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়িত হবে।
সংবিধান সংস্কারের প্রেক্ষাপটে রীয়াজ উল্লেখ করেন, গত ষোলো বছরে একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার অস্বাভাবিক সঞ্চয় ঘটেছে, যা সংবিধান তার প্রয়োগে সহায়তা করেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনও করেছে। এই প্রেক্ষিতে তিনি পুনরায় জোর দেন, সংবিধানের পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কার এখনই প্রয়োজন।
জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত মূল বিষয়গুলো হল দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের সংস্কার, সরকারি কমিশনসমূহের কাঠামো, নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া, উচ্চকক্ষের গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। রীয়াজ জানান, এই সব ধারা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কে একমত হওয়া রীয়াজের মতে, ক্ষমতার ভারসাম্য ছাড়া গণতন্ত্রের কার্যকরীতা সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ধারাগুলোকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা স্পষ্ট করা হলে সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
রীয়াজের বক্তব্যের পর, অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া কীভাবে দ্রুততর করা যাবে। রীয়াজ ব্যাখ্যা করেন, সংশোধনী প্রস্তাবনা সংসদে উপস্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কমিটি দ্বারা বিশদ বিশ্লেষণ করা হবে; এরপর দুই‑তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে সংশোধন অনুমোদিত হবে।
সভা শেষে রীয়াজ পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গণভোটের সুষ্ঠু পরিচালনা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানান, ভোটের আগে যথাযথ তথ্য প্রদান এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করার জন্য একসাথে কাজ করতে।
এই আলোচনার পর, বিভাগীয় প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভোটারদের জন্য তথ্যবহুল পুস্তিকা, সেমিনার এবং মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করে। রীয়াজের মতে, এই উদ্যোগগুলো ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের গুরুত্ব বুঝতে এবং দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।



