ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো প্রকাশকের সদর দফতর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুরের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি‑এর সফরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ১৮ ডিসেম্বর সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন পরিদর্শন করে, গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
মিচেল লি দফতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতিগ্রস্ত অফিসের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দিয়ে গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীন ও উন্মুক্ত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
প্রকাশককে সমর্থন জানিয়ে লি বলেন, গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হল স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, যা নাগরিকদের সঠিক তথ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রথম আলো এবং দেশের অন্যান্য মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে আঘাতকারী এই ধরনের হিংসা কোনোভাবেই সহ্য করা যাবে না।
এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে ১৮ ডিসেম্বর রাতের ঘটনা, যখন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার দুটো সংবাদপত্রের অফিসে প্রবেশ করে, ভাঙচুর, লুটপাট এবং আগুনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হুমকি সৃষ্টি করে।
সেই রাতে দুইটি ভবনই ব্যাপকভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়, ফলে বহু কর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারী আহত হন। ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, তবে সম্পূর্ণ ধ্বংসের পরিণতি এখনও পুনর্গঠন পর্যায়ে রয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই হামলা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত তদন্তের আদেশ জারি করে এবং দায়ীদের বিচারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মানবাধিকার সংস্থা সকলেই এই হামলাকে নিন্দা করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের দিক থেকে, মিচেল লি উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এই ধরনের হিংসা উভয় দেশের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি স্বরূপ। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের সরকার বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীনতা রক্ষায় সব ধরণের সমর্থন প্রদান করবে।
একজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, তিনি উল্লেখ করেন যে, মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী হামলা কেবল স্থানীয় নিরাপত্তা নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। তিনি যুক্তি দেন, এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া এবং তথ্য নিরাপত্তা নীতির পুনর্বিবেচনা দাবি করে।
এ ধরনের আক্রমণ পূর্বে মিশরে এবং তুরস্কে ঘটেছে, যেখানে সাংবাদিকদের ওপর হিংসা মিডিয়া স্বাধীনতার ক্ষয় এবং জনমত গঠনে হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে নতুন, যা দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করবে।
গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ বন্ধ করার জন্য সরকার স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে, সংশ্লিষ্ট সব প্রমাণ সংগ্রহ এবং দায়ীদের আইনি দায়িত্বে আনার কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও প্রকাশ করা হবে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই ঘটনার পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাইবার ও শারীরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন হবে। তারা জোর দিয়ে বলেন, মিডিয়া সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল জাতীয় নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ।
সারসংক্ষেপে, মিচেল লি’র ভিজিট এবং তার প্রকাশিত সমর্থন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ভবিষ্যতে স্বাধীন তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট আইনি পদক্ষেপ দেশের নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



