ইরানের রাজধানী তেহরানে যুক্তরাজ্যের দুজন নাগরিক, ক্রেগ ও লিন্ডসে ফোরম্যান, গত জানুয়ারি ২০২২-এ গোপনীয় তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে গ্রেফতার হন। তাদের পুত্র জো বেনেট, যুক্তরাজ্যের বিদেশি ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের (FCDO) সঙ্গে যোগাযোগের পর, বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তেহরানের ব্রিটিশ দূতাবাসের সাময়িক বন্ধের পর, পরিবারটি এখন কোন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
ফোরম্যান দম্পতি বিশ্ব ভ্রমণকালে ইরানে প্রবেশ করে, স্থানীয় নিরাপত্তা সংস্থার দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে স্পাইং অভিযোগে অভিযুক্ত হন। তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান, এবং কোনো আনুষ্ঠানিক দোষারোপ বা শাস্তি প্রকাশিত হয়নি। যুক্তরাজ্য সরকার তাদের কেসকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছে।
বিনেটের মতে, তার বাবা-মা বর্তমানে “বিপজ্জনক অবস্থায়” আছেন এবং প্রতিবাদে সৃষ্ট বিশাল জনসমাগমের ফলে জেলখানার ভিড় বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, শহরে চলমান বিরোধী-সরকারি প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে জেলখানার পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি দম্পতির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনেটের শেয়ার করা তথ্য অনুযায়ী, জেলখানার রন্ধনশালায় কীটপতঙ্গের উপস্থিতি এবং শোয়ানোর জায়গায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত ভিড়ের ফলে ঘুমের ঘাটতি এবং দৈনন্দিন রুটিনে ব্যাঘাত ঘটছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, জেলখানার ভেতরে প্রায় প্রতিদিনই মারামারির শব্দ শোনা যায়, যা বন্দীদের জন্য অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
যুক্তরাজ্য সরকার বুধবার তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের সাময়িক বন্ধের ঘোষণা দেয়। সরকারী মুখপাত্র জানিয়েছেন, দূতাবাস এখন দূরবর্তীভাবে পরিচালিত হবে এবং কনসুলার সেবা সম্পর্কিত ভ্রমণ পরামর্শ আপডেট করা হয়েছে। নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে, সব কনসুলার কর্মী ও দূতকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বিদেশি ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (FCDO) জানিয়েছে, তারা এখনও পরিস্থিতি মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফোরম্যান দম্পতির কেস নিয়ে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, তারা ইরানের সাথে সংলাপের মাধ্যমে দম্পতির মুক্তি বা ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
বিনেটের মতে, তার বাবা-মা যদি মুক্তি পান, তবে প্রথমে তারা দূতাবাসে গিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তবে দূতাবাসের বন্ধ হওয়ায় এখন তাদের জন্য কোনো স্পষ্ট পথ নেই। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, “তাদের পরিকল্পনা ছিল দূতাবাসে যাওয়া, কারণ তারা তা নিরাপদ স্থান বলে মনে করতেন, এখন তারা কোথায় যাবে, কী করবে তা অজানা।”
ইরানে গত কয়েক মাসে তীব্র প্রতিবাদ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের ফলে বহু বিদেশি দূতাবাসের নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। তেহরানের পাশাপাশি, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোরও কনসুলার কর্মীকে সুরক্ষিত স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই ধারা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ফলে দূতাবাসের বন্ধ একটি “প্রতীকী পদক্ষেপ” হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্ত ইরানের সঙ্গে সংলাপের নতুন রূপের সূচনা হতে পারে, তবে একই সঙ্গে মানবিক উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ব্রিটিশ সরকার ইতিমধ্যে তেহরানে ভ্রমণ পরামর্শকে “অত্যন্ত সতর্কতা” স্তরে আপডেট করেছে, এবং নাগরিকদেরকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছে। এই পরামর্শে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি, প্রতিবাদে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং কনসুলার সেবার সীমিত প্রাপ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত, ফোরম্যান দম্পতির পরিবার এবং যুক্তরাজ্য সরকার উভয়ই ইরানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ বজায় রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো কনসুলার সহায়তা বা মানবিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে। তেহরানে বর্তমান নিরাপত্তা অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের প্রেক্ষিতে, দম্পতির মুক্তি বা ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা একটি জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।



