বন্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির হেডম্যানপাড়া গ্রামটি সীমান্ত সড়কের পাশে অবস্থিত, যেখানে মাইন বিস্ফোরণের শিকার অন্তাই তঞ্চঙ্গ্যা তার ছোট দোকান চালাচ্ছেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে জুমের কাজের সময় তিনি এক মাইন বিস্ফোরণে বাম পা হারিয়ে ফেলেন এবং এখন অক্ষম অবস্থায় আছেন।
অন্তাই ৩০ বছর বয়সী, সুদর্শন চেহারার একজন যুবক, যিনি পূর্বে জুমের জমি তৈরি করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বিস্ফোরণের পর তিনি কয়েক মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, যেখানে ক্রাচ ব্যবহার করে শারীরিক পুনর্বাসন চালিয়ে গেছেন। তবে এখন আর জুমের কাজ করতে পারছেন না।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সীমান্ত সড়কের পাশে একটি ছোট দোকান খুলে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। দোকানের সামনে খোলা পান, সুপারি এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাত পণ্য সাজানো আছে; পাশের র্যাকে বিস্কুট, সয়াবিন তেলের ছোট বোতল এবং দশ টাকার গুঁড়া দুধের প্যাকেট রাখা আছে।
দোকানের আয় মূলত স্থানীয় গ্রাহকদের কাছ থেকে আসে, যাঁরা পানীয়, সিগারেট এবং অন্যান্য দৈনন্দিন সামগ্রী কিনতে আসেন। অন্তাই নিজে গ্রাহকদের সেবা দেন, যদিও তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার ডান পা দিয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়, আর বাম পা না থাকায় ক্রাচের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অন্তাই জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের চিকিৎসা খরচ প্রায় দুই লক্ষ টাকা হয়েছে। এছাড়া দোকান গড়ে তুলতে প্রায় সত্তর হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যা সবই ঋণ ও ধার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকার থেকে মাত্র বিশ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছেন, বাকি সব খরচ নিজে বহন করতে হয়েছে।
অন্তাইয়ের পরিবারে তার স্ত্রী এবং ছয় বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। আর্থিক দিক থেকে তিনি এখনো কঠিন অবস্থায় আছেন; সরকারী সহায়তা সীমিত হওয়ায় তিনি ধার নিয়ে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন। তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
অন্তাইয়ের শারীরিক অবস্থা ও আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক দিকেও প্রভাব পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিস্ফোরণের পরের স্মৃতি খুবই ফাঁকা, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাকে উদ্বিগ্ন করে রাখে।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা অন্তাইকে নিয়মিত ফলো‑আপ করে, তবে প্রোস্থেটিক সাপোর্ট ও পুনর্বাসনের জন্য যথেষ্ট সম্পদ নেই। মাইন বিস্ফোরণের শিকারদের জন্য বিশেষ কোনো সরকারি পরিকল্পনা না থাকায়, তার মতো বহু মানুষই একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন।
অন্তাইয়ের গল্পটি কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ঘুরে দেখা গিয়েছে। তিনি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যাতে অন্য শিকারদেরও সচেতনতা বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, মাইন বিস্ফোরণের ফলে শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক ট্রমা মোকাবিলার জন্য সমন্বিত সেবা প্রয়োজন। পুনর্বাসন কেন্দ্র, মানসিক পরামর্শ এবং আর্থিক সহায়তা একসাথে প্রদান করলে শিকারদের পুনরায় স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব।
অন্তাইয়ের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে দেখা যায়, সীমান্ত অঞ্চলের শারীরিক ও সামাজিক অবকাঠামো এখনও উন্নয়নের প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে শিকারদের জন্য প্রোস্থেটিক, ঋণমুক্ত ঋণ এবং প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা জরুরি।
অন্তাই তঞ্চঙ্গ্যা এবং তার পরিবারের জন্য অবিলম্বে আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন সেবা এবং মানসিক পরামর্শের ব্যবস্থা করা হলে তাদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। এই ধরনের সহায়তা শিকারদের পুনরায় কর্মসংস্থান অর্জনে সহায়তা করবে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
শ্রোতারা যদি অন্তাইয়ের মতো শিকারদের জন্য দান বা স্বেচ্ছাসেবী সেবা দিতে ইচ্ছুক হন, তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা সরকারি সামাজিক কল্যাণ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এভাবে ছোট ছোট সহায়তা একত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



