বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ২০২৫ সালে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। দেশের জনসংখ্যা, নগরায়ণ, অর্থনৈতিক কাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থার চারটি বড় পরিবর্তন একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে, যা পূর্বের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে নতুন জটিলতা ও ব্যয়ের স্তরে নিয়ে গেছে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর দেশটি ৭৫ মিলিয়ন মানুষসহ ভাঙা অর্থনীতির সাথে শুরু করেছিল। তখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশকে “বাস্কেট কেস” বলে সমালোচনা করলেও, স্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশটি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লবণাক্ত পানির মাধ্যমে কলেরার রোগের মোকাবিলা, দরজায়-দরজায় পরিবার পরিকল্পনা কর্মী দ্বারা জন্মহার কমানো, গার্মেন্টস খাতে মেয়েদের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা এবং ছোটখাটো কৃষকদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা এসবের মধ্যে প্রধান ছিল।
এখন, ২০২৫ সালে দেশটি আর ১৯৭০‑এর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নয়, বরং চারটি সমন্বিত পরিবর্তনের মুখোমুখি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীর হলেও গৃহস্থালির আর্থিক মার্জিন কমে গেছে; নগর এলাকায় দ্রুত বিস্তারমান জনসংখ্যা অবকাঠামোর চাপ বাড়াচ্ছে; গার্মেন্টস ও রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি পুরনো শ্রমিক মডেল থেকে দূরে সরে নতুন দক্ষতা ও প্রযুক্তি প্রয়োজন; আর শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত মানের উন্নতি না হলে ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি প্রস্তুত হবে না।
প্রায়োগিক গবেষণা সংস্থা PPRC-র সাম্প্রতিক তথ্য দেখায়, “জনসংখ্যা ভাগের লাভ” নিয়ে অতীতের আশাবাদী ধারণা এখন প্রশ্নের মুখে। বাড়ির আয় ও ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য কমে যাওয়ায় গৃহস্থালির আর্থিক নিরাপত্তা হ্রাস পাচ্ছে। যখন পরিবারগুলো সীমিত সম্পদে জীবনযাপন করে, তখন পূর্বের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বজায় থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, নীতি পরিবর্তনের ধীরগতি ও গৃহস্থালির ঋণবহুলতা একসাথে একটি সংকটের সূচনা করতে পারে, যা এক প্রজন্মের অর্জনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বিশ্লেষক ও বিরোধী দল সরকারের নীতি সমালোচনা করেছে। তারা যুক্তি দেয়, সরকার এখনও সস্তা শ্রম ও ফ্রুগাল উদ্ভাবনের উপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। নগরায়ণ ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য বৃহৎ বিনিয়োগের অভাব, পাশাপাশি গার্মেন্টস খাতের মুনাফা ভাগাভাগি করার পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। বিরোধীরা দাবি করে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও গৃহস্থালির আর্থিক চাপ বাড়ার ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় নতুন নীতি প্রণয়ন চলছে। জনসংখ্যা পরিকল্পনা, নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এই নীতিগুলো বাস্তবায়নে সময় ও সম্পদের প্রয়োজন, যা রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সমাধান না হলে আসন্ন নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো সরকারের কর্মক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। গৃহস্থালির আর্থিক সংকট বাড়লে ভোটারদের প্রত্যাশা পরিবর্তিত হতে পারে, যা ভোটের প্রবণতায় প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, সরকার যদি কার্যকরী সংস্কার বাস্তবায়ন করে, তবে তা ভোটারদের আস্থা বাড়িয়ে নির্বাচনী সুবিধা দিতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ৫০ বছরের চমৎকার অগ্রগতি শেষে এখন নতুন স্তরের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনসংখ্যা, নগরায়ণ, অর্থনীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রের সমন্বিত পরিবর্তনগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা না হলে নীতি বিচ্যুতি ও গৃহস্থালির আর্থিক অস্থিরতা একসাথে দেশের অর্জনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশও এই সমস্যার সমাধানের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের দিক নির্ধারণ করবে।



