বাংলাদেশের রেডি‑মেড গার্মেন্টস (RMG) খাত, যা প্রায় ৪.২ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সরবরাহ করে, এখন জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল স্বয়ংক্রিয়তার দ্বৈত চাপের মুখে। এই দুইটি রূপান্তর শিল্পের উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি আয় এবং বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
“ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর” ধারণা ১৯৭০‑এর দশকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো দ্বারা পরিবেশগত নিয়মের ফলে প্রভাবিত কর্মীদের সহায়তা চাওয়ার প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হয়। সময়ের সাথে সাথে এই ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত হয়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের বোঝা ও খরচের অসম বণ্টন মোকাবিলার জন্য কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
বৈশ্বিকভাবে, কার্বন নির্গমন কমাতে শিল্পগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করতে হচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পে এটি মানে শক্তি সাশ্রয়ী মেশিন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং কম জল ব্যবহারকারী উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করা। তবে বাংলাদেশে বিদ্যমান সম্পদ সীমাবদ্ধতা এবং শিল্পের উচ্চ দূষণ মাত্রা এই রূপান্তরকে চ্যালেঞ্জপূর্ণ করে তুলেছে।
একই সময়ে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়তা গার্মেন্টস উৎপাদনের ধাপগুলোকে দ্রুততর ও কম শ্রমনির্ভর করে তুলছে। কাটিং, সেলাই এবং গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের হার বাড়ছে, যা কর্মীর কাজের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। শ্রমিক অধিকার রক্ষা করা এবং প্রযুক্তি গ্রহণের মধ্যে সমতা বজায় রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
RMG খাত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত, এবং দেশের মোট জিডিপির ১০%‑এর বেশি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৮৪% এই খাত থেকে আসে। বিশেষ করে নারীরা এই শিল্পের প্রধান কর্মশক্তি, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে। তবে একই সঙ্গে, এই সেক্টরটি বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য জলবায়ু‑সংক্রান্ত দুর্যোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বছরের পর বছর বন্যা ও তাপপ্রবাহের ফলে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ডেলিভারি সময়সীমা মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, মুনাফা কমে এবং রপ্তানি অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। এই পরিস্থিতি কর্মীদের বেতন ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, স্বয়ংক্রিয়তা গ্রহণের ফলে উৎপাদনের গতি বাড়লেও, দক্ষ কর্মীর চাহিদা নতুন করে গড়ে ওঠে। রোবোটিক কাটিং মেশিন ও স্বয়ংক্রিয় সেলাই লাইন চালু হলে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পী শ্রমিকদের কাজের সুযোগ হ্রাস পেতে পারে। তাই কর্মশক্তির পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রোগ্রাম ছাড়া রূপান্তর অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর না করা হয়, তবে কর্মসংস্থান হ্রাসের ফলে বেকারত্বের হার বাড়বে এবং রপ্তানি আয় হ্রাস পাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্যদিকে, সরকার ও শিল্প সংস্থা যদি সবুজ প্রযুক্তি ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করে, তবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই পণ্যের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।
প্রয়োজনীয় নীতি সমূহের মধ্যে রয়েছে কর্মীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জাল, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা, এবং নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম। এছাড়া, কারখানাগুলোকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা, জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা প্রদান এবং পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলার জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রমবর্ধমানভাবে টেকসই ও নৈতিক উৎপাদন চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। যদি বাংলাদেশ তার শ্রমিক ভিত্তিক শক্তিকে পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক করে তুলতে পারে, তবে গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলকতা বজায় থাকবে এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়বে। তবে এর জন্য রূপান্তর প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের অধিকার, লিঙ্গ সমতা এবং পরিবেশগত দায়িত্বকে সমানভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক।
সংক্ষেপে, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বয়ংক্রিয়তার দ্বৈত চাপের মোকাবিলায় ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর কেবল কর্মী অধিকার রক্ষার নয়, বরং বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের টেকসই বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়াবে। সঠিক নীতি, প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এই রূপান্তরকে সুশৃঙ্খল করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান উভয়েরই সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।



