কুড়িগ্রাম জেলার বেশিরভাগ বাসিন্দা, হোটেল ও পরিবহন সেক্টরের ব্যবহারকারীরা, সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র এলপিজি সংকটের মুখোমুখি। সরকারী গ্যাসের একক দাম ১,৩০৬ টাকা হলেও, ডিলার পয়েন্টে সিলিন্ডার ক্রয়ের চূড়ান্ত মূল্য ১,৬০০ থেকে ১,৮০০ টাকার মধ্যে পৌঁছাচ্ছে। এই মূল্য পার্থক্য সরবরাহের ঘাটতি এবং পরিবহন খরচের বৃদ্ধি থেকে উদ্ভূত, যা গ্রাহকদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা হোটেল, গৃহস্থালি ও গাড়ি চালানোর জন্য এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করে। শহরের বাসিন্দাদের জন্য সিলিন্ডার গ্যাস দীর্ঘদিনের প্রধান রান্নার জ্বালানি, এবং এই নির্ভরতা এখন দামের উত্থান ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে হুমকির মুখে।
দেশব্যাপী গ্যাসের ঘাটতি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্রতর হয়েছে, ফলে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ যথেষ্ট নয়। সরকারী দাম যদিও স্থির, তবে ডিলাররা ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং স্বাভাবিক মুনাফা যোগ করে বিক্রি করছেন, যার ফলে গ্রাহকদের হাতে চূড়ান্ত দাম বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রানা জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্যাস সিলিন্ডার কেনা এখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গ্যাস না পেয়ে বাড়িতে রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এই পরিস্থিতি দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।
পৌরসভার বাসিন্দা রতন চন্দ্রও একই রকম সমস্যার মুখোমুখি। তিনি বলেন, গ্যাসের ঘাটতি বাড়ির রান্না চালাতে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং কখনো কখনো টাকা দিলেও গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। এই ধরনের ঘাটতি গৃহস্থালির মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা দেয়।
শাপলা চত্বরে অবস্থিত জান্নাত হোটেলের মালিক মুন্না জানান, গ্যাসের দাম বাড়লেও খাবারের দাম সমানভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়, ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে। হোটেল ব্যবসা, যা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, এখন অতিরিক্ত ব্যয়কে গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিতে পারছে না, ফলে লাভের মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে।
যমুনা এলপিজি গ্যাস ডিলার বদরুল আহসান মামুন ব্যাখ্যা করেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ক্রয়মূল্য, পরিবহন খরচ এবং স্বাভাবিক মুনাফা যোগ করে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে, যা পূর্বের দামের তুলনায় সিলিন্ডারের দামকে প্রায় দ্বিগুণ করে তুলেছে।
গ্যাস সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালু করেছে। কুড়িগ্রাম ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. শেখ সাদী জানান, প্রতিদিন বাজারে সিন্ডিকেট গঠনকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অতিরিক্ত দামের বিক্রয় বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে।
বাজারে গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক খরচে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁর মতো গ্যাস-নির্ভর সেক্টরে মুনাফা হ্রাসের পাশাপাশি, গ্রাহকদের জন্য খাবারের দাম বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, যা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিতে অবদান রাখবে। একই সঙ্গে, গ্যাসের ঘাটতি বাড়িতে রান্না করা কঠিন করে তুলছে, ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার বা খাবার সংরক্ষণে পরিবর্তন আসতে পারে।
অধিকাংশ বিশ্লেষক অনুমান করেন, সরবরাহ শৃঙ্খলে কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে দাম আরও বাড়তে পারে এবং ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হতে পারে। সরকারী নিয়ন্ত্রণ ও ডিলারদের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের তদারকি, পাশাপাশি গ্যাসের সঞ্চয় ও বিতরণ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, এই সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিকল্প জ্বালানি উৎসের বিকাশ এবং গ্যাসের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা, স্থানীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার মূল চাবিকাঠি হবে।



