ইরানের শাসক পরিবার থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত রেজা পাহলভি, যদি শীঘ্রই ক্ষমতায় আসেন তবে দেশের সামরিক‑নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক প্রকল্পকে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণা ইরানের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিবাদ ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি যখন শীর্ষে, তখনই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নতুন শাসনামলে ইরানকে সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও উল্লেখ করেছেন।
রেজা পাহলভি, শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির জ্যেষ্ঠ সন্তান, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। তার পরিবার ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি ১৬ তারিখে দেশত্যাগের পর থেকে বিদেশে বসবাস করে আসছে। দীর্ঘদিনের বিরোধী গোষ্ঠীর সমর্থন ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে থাকা রেজা, এখন নিজেকে ইরানের ভবিষ্যৎ গঠনের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
পাহলভি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তার শাসনামলে পারমাণবিক কর্মসূচি, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু, তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ইরানের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে তিনি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা হ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ইচ্ছা উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, রেজা পাহলভি নিশ্চিত করেছেন যে তার শাসনামলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কোনো সহায়তা বন্ধ হবে। তিনি মাদক পাচার, চরমপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থন এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতি ইরানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে কমাতে এবং দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম পুনর্গঠনে সহায়তা করবে বলে তিনি দাবি করেন।
বৈদেশিক নীতিতে রেজা পাহলভি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন এবং ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন। এছাড়া, তিনি ‘আব্রাহাম চুক্তি’ ও ‘সাইরাস চুক্তি’র সম্প্রসারণের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও সহযোগিতা বাড়াতে পারে। এই নীতিগুলি ইরানের ঐতিহ্যবাহী অ-ইসরায়েলি অবস্থান থেকে বিচ্যুতি নির্দেশ করে এবং অঞ্চলে নতুন কূটনৈতিক গতিবিধি তৈরি করতে পারে।
ইরানে বর্তমানে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ তীব্রতর হচ্ছে, যেখানে নাগরিকরা অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রাস্তায় বেরিয়েছেন। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তেহরানের সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। রেজা পাহলভির এই ঘোষণাগুলি এমন একটি সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক চাপ উভয়ই শীর্ষে রয়েছে।
ইরানের প্রতিষ্ঠিত শাসন কাঠামো ও ধর্মীয় নেতারা রেজা পাহলভির পরিকল্পনাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন। পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া উভয়ই কঠোর রক্ষণশীল গোষ্ঠীর জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। তেহরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রেজা পাহলভির নীতিগুলিকে দেশের সার্বভৌমত্বের ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং তার শাসনামলে পরিবর্তন আনা কঠিন হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার রেজা পাহলভির প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, তবে বাস্তবায়নের আগে নির্দিষ্ট শর্ত ও যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম বন্ধের দিকে অগ্রসর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা চায়। ইসরায়েলও ইরানের স্বীকৃতির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে, তবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
রেজা পাহলভির ঘোষণার পরবর্তী ধাপগুলো নির্ভর করবে তার রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তোলার সক্ষমতা এবং ইরানের অভ্যন্তরে বিদ্যমান শক্তির ভারসাম্যের ওপর। যদি তিনি শাসন গ্রহণ করেন, তবে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, সন্ত্রাসী সমর্থন শেষ এবং বিদেশি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে থাকবে। একই সঙ্গে, ইরানের অভ্যন্তরে বিদ্যমান বিরোধী গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল নীতির পরিবর্তন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিবেশকে পুনর্গঠন করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না হলেও, রেজা পাহলভির প্রস্তাবিত নীতি পরিবর্তনগুলো অঞ্চলের কূটনৈতিক গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে। তার শাসনামলে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, সন্ত্রাসী সমর্থন শেষ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল মিত্র হিসেবে পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।



