জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য “চাঁদাবাজ ডটকম” (chandabaj.com) নামের একটি বিশেষ ওয়েবসাইট এবং একটি জাতীয় হটলাইন চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তিনি ঢাকা‑৮ আসন থেকে “শাপলা কলি” প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং এই ডিজিটাল উদ্যোগকে তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। পাটোয়ারী উল্লেখ করেন, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি তথ্য প্রদান করতে পারবেন এবং তাদের নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তথ্যের যথাযথ যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে প্রমাণ উপস্থাপন করে তাদের রাজনৈতিক পদত্যাগের জন্য সতর্ক করা হবে।
প্রস্তাবিত হটলাইন এবং ওয়েবসাইটের কাজের পদ্ধতি সহজ: ব্যবহারকারী ফোন বা অনলাইন ফর্মের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, ঘুষ, বা অন্য কোনো দুর্নীতিকর কাজের বিবরণ পাঠাবেন, আর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণ করবে এবং গোপনীয়তা রক্ষা করবে। পাটোয়ারী জানান, তথ্য সংগ্রহের পর একটি স্বতন্ত্র দল প্রমাণ বিশ্লেষণ করবে এবং যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলে তা সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় যদি অপরাধী পদত্যাগ না করেন, তবে দলটি রাজনৈতিক বয়কটের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করেছে।
পাটোয়ারী আরও উল্লেখ করেন, ওয়েবসাইট ও হটলাইন শীঘ্রই জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে এবং এটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ছোট ব্যবসা ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর বাড়তে থাকা চাঁদাবাজির শিকড় কেটে ফেলতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও জনসচেতনার সমন্বয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা করা এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। এই পরিকল্পনা সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে; অনেক ব্যবহারকারী এটিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রশংসা করছেন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী দলের কিছু সদস্য এই উদ্যোগকে নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, এমন একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা কতটা হবে এবং তথ্যের অপব্যবহার বা রাজনৈতিক হেরফেরের ঝুঁকি কী হতে পারে। কিছু বিরোধী কণ্ঠস্বর দাবি করেন, এই ধরনের সেবা যদি যথাযথ তদারকি ছাড়া চালু করা হয়, তবে তা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একটি সরঞ্জাম হয়ে উঠতে পারে। তবু কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এটিকে নাগরিক সমাজের স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
পাটোয়ারী স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্রকল্পের লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক পার্টির জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান নয়; তিনি জোর দিয়ে বলছেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, চাঁদাবাজ ডটকম ও হটলাইন চালু রাখা হবে এবং তা নাগরিকদের সেবা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, মৌখিক প্রতিবাদে চাঁদাবাজি বন্ধ করা কঠিন, তবে প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অপরাধীদের কোণঠাসা করা সম্ভব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে তুলে ধরেছেন এবং জোর দিয়েছেন, সফল হলে এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, ওয়েবসাইটের উন্নয়ন কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। হটলাইনটি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকবে এবং তথ্য সংগ্রহের পর তা দ্রুত বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। পাশাপাশি, জনগণের মধ্যে এই সেবার ব্যবহার বাড়াতে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করা হবে, যাতে প্রত্যেক নাগরিক জানে কীভাবে তথ্য প্রদান করতে হবে এবং গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা হবে।
পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন, চাঁদাবাজ ডটকমের সাফল্য মূলত সরকারের তথ্যের উপর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা এবং হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। যদি সরকার এই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তি দেয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ এই প্ল্যাটফর্মে বিশ্বাস রাখবে। অন্যদিকে, যদি তথ্য উপেক্ষা করা হয় বা গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়, তবে এই উদ্যোগের প্রতি আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।
আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনের সময় এই ধরনের ডিজিটাল সরঞ্জাম ভোটারদের মনোভাব গঠন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রমাণভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে ভোটাররা পার্টি ও প্রার্থীদের দুর্নীতিকর আচরণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন, যা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের মধ্যে স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে এই ধরনের প্ল্যাটফর্মকে গ্রহণ করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারীর ঘোষিত চাঁদাবাজ ডটকম ও জাতীয় হটলাইন একটি নতুন ডিজিটাল উদ্যোগ, যা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি মোকাবেলায় তথ্য সংগ্রহ, গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাজের স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে। এর বাস্তবায়ন ও ফলাফল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে কী পরিবর্তন আনবে, তা সময়ই বলবে।



