ঢাকার সিআইডি বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুইজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত, যারা জাতীয় পরিচয়পত্রের গোপন তথ্য চুরি ও বিক্রির মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি আয় করছিল।
সিআইডি বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী পদে কর্মরত এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে কাজ করতেন এবং অভ্যন্তরীণ ডেটাবেসে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই গোষ্ঠী নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ তথ্যভাণ্ডারে অননুমোদিত প্রবেশ করে নাগরিকদের এনআইডি রেকর্ড পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। তারা ভুয়া তথ্য যুক্ত করে নথি পরিবর্তন করত এবং সংশোধিত ডেটা বিভিন্ন চাহিদা সম্পন্ন গ্রাহকের কাছে বিক্রি করত।
সংগৃহীত তথ্যের ক্রেতা ছিল ব্যাংক, বীমা সংস্থা এবং কিছু অনলাইন সেবা প্রদানকারী, যারা সঠিক পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ডেটা ব্যবহার করত। বিক্রির মাধ্যমে তারা মাসিক কোটি টাকার বেশি আয় করছিল, যা দীর্ঘ সময়ের গোপন কার্যক্রমের ফলাফল।
সিআইডি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারছে না যে, এই চক্রে নির্বাচন কমিশনের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন কিনা; তাই এই দিকটি তদন্তের অংশ হিসেবে গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রেকর্ড ও ইমেল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সহায়তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কার্যক্রমের পরিধি ও কতজন নাগরিকের তথ্য লঙ্ঘিত হয়েছে তা নির্ণয় করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রাথমিকভাবে কয়েকশো নাগরিকের ডেটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সিআইডি দল এই তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা করছে।
অবৈধভাবে এনআইডি সংশোধন ও ভুয়া তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে আর্থিক বা রাষ্ট্রীয় জালিয়াতির সম্ভাবনা আছে কিনা, তা সিআইডি গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ট্রেস অনুসরণ করে সম্ভাব্য অর্থ পাচার চ্যানেল চিহ্নিত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মামলায় নির্বাচন কমিশনের তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির দুর্বলতাগুলোও তদন্তের গুরুত্বের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। সিআইডি বিশেষজ্ঞরা সিস্টেমের নিরাপত্তা স্তর বাড়াতে প্রযুক্তিগত ও প্রক্রিয়াগত পরিবর্তনের সুপারিশ দিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার বিকালে সিআইডি সদর দপ্তরে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও অপরাধের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে। সম্মেলনে তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের রূপরেখা উপস্থাপন করা হবে।
অধিকর্তারা আশা করছেন, গ্রেপ্তারকৃত দুই ব্যক্তির মাধ্যমে বৃহৎ এনআইডি জালিয়াতি নেটওয়ার্কের কিছু অংশ উন্মোচিত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধের প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। এই ধরণের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর শাস্তি ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হবে।
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতে মামলা দায়ের করা হবে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী তারা তথ্য চুরি, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে দায়ী হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে। তথ্য নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী এনআইডি তথ্যের অবৈধ বিক্রয় ও পরিবর্তন কঠোর শাস্তির আওতায় পড়ে। সিআইডি এই আইন প্রয়োগে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের শাসন নিশ্চিত করবে।
জনসাধারণের মধ্যে এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ এনআইডি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নাগরিকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে।



