২০২৪ সালের ১৮ জুলাই জাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কাজলায় গুলিবিদ্ধ শহীদদের পরিচয় শনাক্তের কাজ শেষ হয়েছে। আটটি পরিবার, যার মধ্যে শোয়েল রানা পরিবারেরও অন্তর্ভুক্ত, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেয়ে আত্মীয়ের কবরের ঠিকানা জানে।
শোয়েল রানা, চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে বড় সন্তান, কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন, যা সেই সময়ের উত্তাল ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত। একই সময়ে দেশের শীর্ষে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শীঘ্রই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
তৎপরতা নিয়ে গৃহীত অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের বেয়ারিশ দাফনকৃত দেহের পরিচয় নির্ধারণের কাজ শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম জুলাই মাসে ৮০টি এবং আগস্টে অতিরিক্ত ৩৪টি মোট ১১৪টি দেহের পুনরুদ্ধার করে।
আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে দেহ উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়। উত্তোলনের পর রায়বাজার কবরস্থানে ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেহগুলো অস্থায়ী মর্গে স্থানান্তরিত করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও ময়নাতদন্ত করা হয়।
পরিচয় নির্ধারণের জন্য অজ্ঞাত পরিচয়ের শহীদদের নয়টি পরিবারের সদস্য ডিএনএ দান করেন। সিআইডি এই নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে আটজনের পরিচয় নিশ্চিত করে। শনাক্ত শহীদদের মধ্যে মো. মাহিন মিয়া, আসাদুল্লাহ, পারভেজ ব্যাপারী, রফিকুল ইসলাম (দুইজন), ফয়সাল সরকার ও কাবিল হোসেন অন্তর্ভুক্ত। অন্য একটি দেহের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া এখনও চলমান।
এই কাজের জন্য আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফনডিব্রাইডারসহ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফরেনসিক দলগুলো ডিএনএ বিশ্লেষণ ও দেহের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে সমর্থন প্রদান করে।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর শোয়েল রানা পরিবারের সদস্যরা জানায়, “কবরডা পেয়ে একটু শান্তি পেয়েছি”। শোয়েল রানা ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান, তার কবরের সঠিক অবস্থান জানলে তার সন্তান ও বোন-ভাইদের মানসিক চাপ কমে।
একইভাবে ২৩ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি পারভেজ ব্যাপারীর কবরের নম্বর ২৪ নির্ধারিত হয়েছে। তার বাবা সবুজ ব্যাপারী বহুদিনের পর চাঁদপুরের মতলব থেকে রায়বাজারে এসে জিয়ারত করেন, যা পরিবারকে দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি থেকে মুক্তি দেয়।
আনজুমান মুফিদুল ইসলামের স্বেচ্ছাসেবকরা দেহ উত্তোলন, ডিএনএ সংগ্রহ ও ময়নাতদন্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তাদের কাজের ফলে বেয়ারিশ দাফনকৃত শহীদদের পরিবারগুলোকে শেষ পর্যন্ত আত্মীয়ের শেষ বিশ্রামস্থল জানার সুযোগ মিলেছে।
আইনি দিক থেকে, আদালতের আদেশ অনুসারে দেহ উত্তোলন ও ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে। সিআইডি ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে করা কাজের ফলাফল ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
শহীদদের পরিবারগুলো এখন কবরের সঠিক অবস্থান জানার পর আত্মীয়দের স্মরণে সমাধি পরিষ্কার করে, ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়া শহীদদের আত্মার শান্তি ও পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামগ্রিকভাবে, জুলাই ২০২৪ গুলিবিদ্ধ শহীদদের পরিচয় শনাক্তের কাজ দেশের মানবিক দায়িত্বের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, আদালত, ফরেনসিক দল এবং সরকারী সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা শহীদদের পরিবারকে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি এনে দেয়।



