জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই চার্টার রেফারেন্ডামের সময়সূচি ঘোষিত হওয়ার পর ৩,৪০৭ জন প্রার্থী প্রস্তাবনা পত্র সংগ্রহ করেন। এদের মধ্যে ২,৫৮২ জন প্রার্থী ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য প্রস্তাবনা জমা দিয়েছেন। এই নির্বাচনটি পূর্বের শাসনবিনাশকারী গণউত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত।
নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রচারপত্র, পোস্টার, রেলি এবং দলীয় চুক্তির ঝলক দেখা যায়। সাধারণ নাগরিকদের জন্য নির্বাচন আশা ও পরিবর্তনের প্রতীক হওয়া উচিত, তবে বহু মানুষ ভোটের ফলাফলের পরেও পরিবর্তনের অভাব অনুভব করছেন। এই হতাশার মূল কারণ হল, দেশের রাজনীতি এখন সেবা নয়, ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখন উচ্চ মুনাফা ও বস্তুগত পুরস্কার নিয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, ফলে আরও বেশি মানুষ এই পথে পা বাড়াচ্ছেন এবং নতুন দলগুলো ক্রমাগত উদ্ভব হচ্ছে। স্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি সুস্থ গণতন্ত্রে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল নাগরিকদের সেবা করা, আইন প্রণয়ন, প্রতিনিধিত্ব এবং সরকারের কার্যক্রমের তদারকি করা।
বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের ঐতিহাসিকভাবে আইন প্রণয়নের চেয়ে আর্থিক ও নির্বাহী বিষয়গুলোতে বেশি জড়িত থাকার প্রবণতা দেখা যায়। তারা কোন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হবে, সরকারি চুক্তি কারা পাবে এবং কী কী গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় পদে কে নিয়োগ পাবে, এ বিষয়ে প্রভাব রাখেন। ফলে টেন্ডার, জমি লেনদেন এবং জনসাধারণের কাজগুলো প্রায়শই যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, রাজনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে অগ্রসর হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সংসদীয় আসনটি দেশের অন্যতম লাভজনক ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত হয়েছে। ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক প্রার্থী কম সম্পদ নিয়ে সংসদে প্রবেশ করে, তবে মেয়াদ শেষে বিশাল সম্পদ, বহু সম্পত্তি এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ অর্জন করে ফিরে যান। স্বচ্ছতা আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ (টিআইবি) এর গবেষণা অনুযায়ী, বেশিরভাগ সংসদ সদস্যের সম্পদে মেয়াদকালে তীব্র বৃদ্ধি দেখা যায়, যার উৎস স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নিয়মিতভাবে রিপোর্ট করে যে, সংসদ সদস্যরা প্রায়শই অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন। এই ধরনের কার্যকলাপের ফলে জনসাধারণের সম্পদ ও উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা হ্রাস পায় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে আর্থিক স্বার্থের সংযোগ দৃঢ় হয়।
আসন্ন ১৩তম জাতীয় নির্বাচন ও চার্টার রেফারেন্ডাম দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন মোড় দিতে পারে। তবে বিশাল সম্পদ সঞ্চয়ের প্রবণতা এবং সংসদ সদস্যদের আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগের কারণে নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে জনসাধারণের মঙ্গলে রূপান্তরিত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, যদি নির্বাচনের পর আইন প্রণয়নের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং সংসদ সদস্যদের আর্থিক স্বার্থ থেকে আলাদা করা যায়, তবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। অন্যদিকে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব নীতির মধ্যে ফারাক বাড়তে পারে, যা নাগরিকদের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম দেবে।
সুতরাং, নির্বাচনের সময়সূচি, প্রার্থীর সংখ্যা এবং রাজনৈতিক পরিবেশের বর্তমান অবস্থা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভোটারদের জন্য এই সময়টি কেবল ভোট দেওয়ার নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগও বটে।



