১৬ বছর বয়সী ফাতেমা, ঢাকা শহরের একটি দরিদ্র পাড়া‑তে আটজনের পরিবারে একক কক্ষ ভাগ করে বসবাস করে। বাড়ির ছাদ টিনের, ঘরটি সংকীর্ণ; তাই সে প্রায়ই বাড়ির বাইরে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে, যাতে ঘরে থাকা একাকীত্ব থেকে মুক্তি পায়।
ফাতেমার মা লক্ষ্য করেন যে পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোর ছেলেরা প্রায়ই ফাতেমার দিকে তাকিয়ে থাকে, যা তাকে উদ্বিগ্ন করে। নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে তিনি কিশোরীকে বাড়িতে আটকে রাখার বদলে তাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও ফাতেমা এখনও সেকেন্ডারি স্কুলের SSC পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে।
মা ও কন্যা উভয়েরই ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল—ফুলের নকশা সহ পোশাক, নিজের আলাদা ঘর। ফাতেমা এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে বিয়ে বেছে নেয় এবং খুব কম প্ররোচনায় সম্মতি জানায়। তার জন্য বিয়ে মানে স্বতন্ত্রতা ও সামাজিক স্বীকৃতি, যদিও তা তার শিক্ষাগত লক্ষ্যকে ত্যাগের সঙ্গে যুক্ত করে।
ফাতেমা বর্তমানে NEET (শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণে না থাকা) তরুণী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের বয়স ১৫‑২৪ বছর। বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন তরুণী NEET, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে দশজনের মধ্যে একজনের বেশি নয়। এই অনুপাত কেবল লিঙ্গভিত্তিক নয়; এক প্রজন্মের NEET নারী পরবর্তী প্রজন্মের পুরুষ ও নারীরও NEET হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, ফলে শ্রমবাজারের দক্ষতা হ্রাস পায়।
উচ্চ NEET হারকে ব্যাখ্যা করা যায় দেশের বিশাল স্তরে শিশুবিবাহের প্রভাবের মাধ্যমে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৫১ শতাংশ কন্যা ১৮ বছরের আগে বিবাহিত হয়েছে। যদিও সামাজিক-অর্থনৈতিক স্তর অনুযায়ী বিশদ তথ্য নেই, তবে বিশ্বব্যাংকের ২১.২ শতাংশ জাতীয় দারিদ্র্য হার ইঙ্গিত করে যে শিশুবিবাহ কেবল দরিদ্র গৃহে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিভিন্ন আয়ের স্তরে বিস্তৃত।
শৈশববিবাহের ফলে ফাতেমার মতো কন্যারা অল্প বয়সেই গর্ভবতী হয়। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে তারা প্রায়ই সামাজিকভাবে নির্ধারিত প্রাপ্তবয়স্কতার ভূমিকা গ্রহণ করে, যদিও তাদের নিজস্ব বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে না। এই দ্রুত গর্ভধারণ শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে দেয় এবং কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে, শিশুবিবাহের ফলে SSC পরীক্ষার প্রস্তুতি ত্যাগ করা এবং বিদ্যালয় ত্যাগের হার বাড়ে। ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হয়, কারণ শিক্ষিত যুবক-যুবতীর সংখ্যা কমে যায় এবং শ্রমবাজারে অযোগ্য কর্মীর অনুপাত বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে, উচ্চ দারিদ্র্য হার এবং শিশুবিবাহের পারস্পরিক সম্পর্ক শ্রমবাজারের গঠনকে আরও জটিল করে তোলে। দারিদ্র্যপূর্ণ পরিবারগুলো সন্তানকে দ্রুত বয়সেই দায়িত্বশীল করে তুলতে চায়, ফলে শিক্ষার সুযোগ কমে যায় এবং NENE (শিক্ষা না থাকা) পরিস্থিতি বাড়ে। এই চক্র ভাঙতে নীতি নির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
শিক্ষা সংস্থাগুলো এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে একসাথে কাজ করে কিশোরী নারীদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে—যেমন বৃত্তি, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং মানসিক পরামর্শ। এভাবে তারা শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।
আপনার আশেপাশে যদি এমন কোনো কিশোরী থাকে যাকে বিয়ে বা কাজের চাপে ত্যাগ করতে বলা হয়, তবে তাকে শিক্ষার গুরুত্ব ও বিকল্প সুযোগ সম্পর্কে জানিয়ে সহায়তা করা একটি বাস্তবিক পদক্ষেপ হতে পারে। আপনার মতামত কী? কীভাবে আমরা একসাথে এই চক্রকে ভাঙতে পারি?



