ইরান সরকার বৃহস্পতিবার ভোরে প্রকাশিত একটি সরকারি নোটিসে জানিয়েছে যে, দেশের আকাশসীমা ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্তের আওতায় পূর্ব অনুমতি ছাড়া সকল বাণিজ্যিক ও গৌণ ফ্লাইট নিষিদ্ধ হবে। তবে আন্তর্জাতিক বেসামরিক ফ্লাইটের কিছু সীমিত চলাচল অনুমোদিত থাকবে।
প্রকাশিত নোটিসটি “নোটিস টু এয়ার মিশনস” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে এবং তেহরানের সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন কর্তৃক জারি করা হয়েছে। নোটিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আকাশসীমা বন্ধের সময়কালে ইরানের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উড়ে যাওয়া সব বিমানকে অনুমতি ছাড়া অবতরণ বা উড্ডয়ন করা যাবে না।
এই নিষেধাজ্ঞা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের বিমান চলাচলে প্রযোজ্য হবে। বিশেষ করে, দেশীয় বাণিজ্যিক, চা-চালনা, প্রশিক্ষণ এবং গৃহস্থালি বিমানগুলো সম্পূর্ণভাবে স্থগিত থাকবে। একই সঙ্গে, বিদেশি বিমানগুলোকে ইরানের ভূ-আকাশে প্রবেশের আগে ইরানের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অনুমোদন নিতে হবে।
কিন্তু নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনপ্রাপ্ত কিছু আন্তর্জাতিক বেসামরিক ফ্লাইট নির্দিষ্ট শর্তে চলতে পারবে। এই ফ্লাইটগুলোকে সীমিত সময়ে এবং নির্দিষ্ট এয়ারপোর্টে অবতরণ ও প্রস্থান করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে অনুমোদন ছাড়া কোনো বিমানকে আকাশসীমা অতিক্রম করার অনুমতি থাকবে না।
আকাশসীমা বন্ধের পেছনে ইরানের অভ্যন্তরে চলমান বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষাপট রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারবিরোধী প্রতিবাদে শহরগুলোতে বিশাল জনসমাবেশ দেখা গিয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি সরকারকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আকাশসীমা বন্ধের কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
অঞ্চলীয় স্তরে, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার ফলে আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্তকে কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে, পারস্য উপসাগরের জ্বালানি রুট এবং বাণিজ্যিক শিপিং লেনের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি তীব্র হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের আকাশসীমা বন্ধকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন, যা অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, আকাশসীমা বন্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে বিকল্প বিমান পথের ব্যবহার বাড়তে পারে এবং এয়ারলাইনগুলোকে রুট পুনর্গঠন করতে হতে পারে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রে, ইরানের এই পদক্ষেপকে কিছু দেশ সমর্থনকারী হিসেবে দেখছে, আবার অন্যরা মানবিক ও বাণিজ্যিক প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করছে। ইরানের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরানের তেল রপ্তানি ও গ্যাস রপ্তানির ওপরও আকাশসীমা বন্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। যদিও তেল ট্যাঙ্কারগুলো সাধারণত সাগরে চলাচল করে, তবে বিমান দ্বারা তেল ও গ্যাসের জরুরি পরিবহন ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এই কারণে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
পাশের দেশগুলোর আকাশসীমা ও এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, তুর্কি, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এয়ারলাইনগুলোকে বিকল্প রুট পরিকল্পনা করতে হবে এবং ইরানের পার্শ্ববর্তী আকাশসীমার অনুমোদন প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।
নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আকাশসীমা বন্ধ থাকবে এবং সেই তারিখের পর পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। সরকার সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে অবহিত করেছে যে, পুনরায় আকাশসীমা খোলার শর্তাবলী নিরাপত্তা পরিস্থিতি, প্রতিবাদ কার্যক্রমের অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপর নির্ভর করবে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের সাময়িক আকাশসীমা বন্ধ দেশীয় অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বজায় রাখার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর বহুমুখী প্রভাব পড়বে, যা পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে স্পষ্ট হবে।



