বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) স্বর্ণের বৈধতা নিশ্চিত করতে এবং আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারকে নতুন উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছে। সমিতির নেতারা গত বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়োজিত ‘মিট দ্য বিজনেস’ সভায় এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। সভাটি রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।
বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান দোলন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে স্বর্ণের কোনো উৎপাদন না থাকলেও দেশে লক্ষ লক্ষ ভরি সঞ্চিত রয়েছে। তিনি বলেন, পূর্বে সরকার ভরিপ্রতি এক হাজার টাকা কর দিয়ে স্বর্ণকে বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল, তবে সেই সুবিধা অনেক ব্যবসায়ী ব্যবহার করতে পারেননি। তাই একই শর্তে পুনরায় এই ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
দোলন স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দুবাই থেকে আমদানি করা সোনায় প্রযোজ্য ভ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আমদানি সময় ৫ শতাংশ এবং বিক্রয় সময় আর ৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ হওয়ায় ভরিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার পার্থক্য দেখা দেয়। এই অতিরিক্ত খরচের ফলে গ্রাহকরা বিদেশি বাজারে সোনার দিকে ঝুঁকছেন।
ভারতে ভ্যাটের হার মাত্র ৩ শতাংশ হওয়ায় ভারতীয় ভিসা চালু হলে বাংলাদেশি ক্রেতা ভারতীয় বাজারে সোনার দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, দোলন এ বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে তবে দেশের স্বর্ণের চাহিদা ও মূল্য কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
ফেন্সি জুয়েলার্সের মালিক অমিত ঘোষও সমিতির আলোচনায় অংশ নেন। তিনি ৫০-৬০ বছরের পুরোনো পারিবারিক ব্যবসার কথা উল্লেখ করে বলেন, লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেও এখনো অনুমোদন পাননি, যদিও কিছু ক্রিকেটারকে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি করতে না পারলেও বর্তমান সরবরাহ চ্যানেলগুলো অনিয়মিত, তাই সরকারকে ট্যাক্সের মাধ্যমে বৈধ ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন।
সোর্সিং সমস্যাকে সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে বাজুসের পরামর্শক স্নেহাশীষ বড়ুয়া উল্লেখ করেন, অনেক দেশ সরকারী চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশও এ ধরনের চুক্তি করে স্বচ্ছ ও বৈধ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে পারে।
বাজুসের এই দাবিগুলো বাজারে স্বর্ণের সরবরাহ-চাহিদা ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অবৈধ চোরাচালান থেকে মুক্তি পেতে সহায়ক হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল রাখতে এবং গ্রাহকের আস্থা বজায় রাখতে করের হার কমিয়ে বৈধকরণ প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
অন্যদিকে, সরকার যদি আমদানি নীতি শিথিল করে এবং লাইসেন্সের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করে, তবে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাই নয়, সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানি-আমদানি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে, ভ্যাটের পার্থক্য কমলে দেশের অভ্যন্তরে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে, যা রপ্তানি সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করবে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, স্বর্ণের বৈধকরণে করের হার যদি অতিরিক্ত উচ্চ হয়, তবে ব্যবসায়ীরা অবৈধ পথে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই নীতি নির্ধারণে করের পরিমাণ এবং সুবিধার মধ্যে সঠিক সমতা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সামগ্রিকভাবে, বাজুসের প্রস্তাবগুলো স্বর্ণের বাজারে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা এবং বৈধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত। সরকার যদি এই দাবিগুলোকে বাস্তবায়ন করে, তবে স্বর্ণের দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাবে এবং অবৈধ চোরাচালান কমে যাবে বলে আশা করা যায়। ভবিষ্যতে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নীতি সমন্বয় এবং বাজার পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।



