মৎস্য অধিদপ্তর ৪২ কোটি ভিয়েতনামি চিংড়ি নাপলি (এক দিনের রেণু) ভারতের মাধ্যমে দেশে আনার অনুমতি দিয়েছে, যা দেশের চিংড়ি হ্যাচারি শিল্পের ভবিষ্যৎ গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে। অনুমোদনটি ৩ ডিসেম্বর মৎস্য অধিদপ্তরের একটি চিঠির মাধ্যমে স্যাটখিরার দেবহাটার তৌফিক এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয় এবং ২৩ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে। আমদানি করা নাপলি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বিধা ফিশ ট্রেডার্স থেকে সরবরাহ করা হবে।
দেশের হ্যাচারি শিল্প বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ লবণশিল্পের মতোই সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পন্ন হিসেবে গর্ব করে, তবে শেব (শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এই অনুমোদনকে আইনবহির্ভূত এবং দেশীয় হ্যাচারি খাতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ জানিয়েছে। শেবের নেতৃত্বের মতে, ভিয়েতনামি চিংড়ি নাপলির উচ্চ চাহিদা সত্ত্বেও, দেশীয় হ্যাচারিগুলো ইতিমধ্যে মানসম্মত পোস্ট-লার্ভা (PL) উৎপাদন করছে এবং অতিরিক্ত আমদানি বাজারে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি করবে।
শেবের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, ভিয়েতনামি নাপলির পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্ল্যাক টাইগার (বাগদা) ও গলদা চিংড়ির নাপলি ও PL আমদানির অনুমতি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে। এই অনুমতিগুলো বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে। শেবের দাবি, অবিলম্বে এই সব অনুমোদন বাতিল করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর তদন্ত চালানো প্রয়োজন।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিয়েতনামি চিংড়ি নাপলির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে কম, যা দেশীয় হ্যাচারিগুলোর জন্য মূল্য হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করে। যদি আমদানি অনুমোদন বাস্তবায়িত হয়, তবে সরবরাহের অতিরিক্ততা মূল্যের পতন ঘটাতে পারে, ফলে হ্যাচারি খাতের মুনাফা কমে যাবে এবং বিনিয়োগের আকর্ষণ হ্রাস পাবে। এছাড়া, কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়বে; হ্যাচারি শিল্পে সরাসরি জড়িত শ্রমিক ও সহায়ক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, আমদানি অনুমোদন সরকারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও বাজারের চাহিদা পূরণের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি দিতে পারে। ভিয়েতনামি চিংড়ি বিশ্ববাজারে উচ্চ চাহিদা পায়, এবং বাংলাদেশ যদি এই সরবরাহ চেইনে অংশ নেয়, তবে রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে শেবের মতে, রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য দেশীয় হ্যাচারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ও গুণগত মান উন্নত করা অধিক কার্যকর।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, হ্যাচারি শিল্পে অতিরিক্ত আমদানি দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে। সরকার যদি নীতি পরিবর্তন না করে, তবে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা মুদ্রা ব্যয় এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াতে পারে। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে দেশীয় বাজারে শূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা ভোক্তা মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে পারে।
শেবের নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান অনুমোদনগুলোকে রদবদল করা এবং নীতি-নিয়মের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। তারা প্রস্তাব করেন, মৎস্য অধিদপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে, হ্যাচারি শিল্পের স্বয়ংসম্পূর্ণতা রক্ষার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গৃহীত হোক। এছাড়া, হ্যাচারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারী সহায়তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা উচিত।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা বিবেচনা করলে, যদি আমদানি অনুমোদন বজায় থাকে, তবে স্বল্পমেয়াদে বাজারে সরবরাহের অতিরিক্ততা দেখা দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় হ্যাচারিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে, যদি সরকার শেবের দাবিগুলো মেনে নীতি সংশোধন করে, তবে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি সম্ভাবনা উন্নত হবে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে।
সারসংক্ষেপে, ভারত থেকে ভিয়েতনামি চিংড়ি নাপলি আমদানি অনুমোদন দেশের হ্যাচারি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত, যার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিশাল। নীতি-নিয়মের সঠিক প্রয়োগ, বাজারের চাহিদা ও উৎপাদন ক্ষমতার সমন্বয় ছাড়া এই ধরনের অনুমোদন শিল্পের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও টেকসই বৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।



