গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের ফলে প্রায় এক লক্ষ শিশুরা চরম অপুষ্টির শিকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে, তিন মাসের যুদ্ধবিরতির পরও অব্যাহত বিমান হামলা ও গুলিবর্ষণে কমপক্ষে একশো শিশুর প্রাণ হারিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই দু’টি বিষয় একসঙ্গে গাজা অঞ্চলের মানবিক সংকটকে আরও তীব্রতর করে তুলেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওয়েলফেয়ার বিভাগ গাজা সম্পর্কে জানিয়েছে যে, সীমাবদ্ধতা ও অবরোধের ফলে শিশুদের পুষ্টি সরবরাহে গুরুতর ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, শিশুরা পর্যাপ্ত ক্যালোরি, প্রোটিন ও মৌলিক ভিটামিনের অভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিপর্যয়কর প্রভাবের মুখোমুখি। সংস্থা এই অবস্থা “আশঙ্কাজনক” বলে সতর্ক করেছে এবং ত্বরিত আন্তর্জাতিক সহায়তা দাবি করেছে।
গাজা অঞ্চলে অব্যাহত শীতল ও শত্রুভাবাপন্ন আবহাওয়াও শিশুদের স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদ্যুৎ ও গরমের অভাবে পরিবারগুলো প্রায়ই কাঠের পাটের ওপর নির্ভর করে শীত মোকাবেলা করে, যা রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার ফলে রোগের বিস্তার দ্রুততর হয়েছে। বিশেষ করে ক্যান্সার রোগের বৃদ্ধি গাজা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
যুদ্ধবিরতির পরেও গাজায় অব্যাহত আক্রমণ শিশুদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শেষ তিন মাসে গাজার বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা ও গুলিবর্ষণে অন্তত একশো শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। এই সংখ্যা অনুমানিক হলেও, বাস্তবিক ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আক্রমণের ফলে বহু শিশু পরিবারহীন হয়ে পড়েছে এবং তারা কাঠের পাটের ওপর বসে অস্থায়ী শরণস্থল খুঁজে বেঁচে আছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গাজা সংকটের সমাধানে বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। মিশর ও কাতার মধ্যস্থতায় গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে মানবিক সহায়তার প্রবাহ বাড়ানোর জন্য নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে অবরোধের সম্পূর্ণ শিথিলতা এখনও অর্জিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দের কথা প্রকাশ করেছে, তবে ইসরায়েলি নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, গাজায় শিশুদের ওপর চলমান মানবিক সংকট কেবলমাত্র তাত্ক্ষণিক খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তায় সমাধান করা সম্ভব নয়; দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও অবরোধের সমাপ্তি ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। তিনি আরও বলেন, গাজা অঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
জাতিসংঘের মুখপাত্রও জোর দিয়ে বলেছেন, গাজায় শিশুদের জীবন রক্ষা করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক দায়িত্ব। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন যে, সব পক্ষই অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে মানবিক সাহায্যকে বাধা না দিয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করবে। এছাড়া, তিনি গাজা স্বাস্থ্য পরিষেবার পুনর্গঠন ও ক্যান্সার রোগীর জন্য বিশেষ চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
গাজা অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা সংকট নিয়ে আলোচনা চলমান, যেখানে কিছু দেশ অবরোধের তীব্রতা কমাতে এবং মানবিক সাহায্যের প্রবাহ দ্রুততর করতে চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সরকার নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে গাজার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সবই অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া গাজা শিশুদের জীবন রক্ষা করা কঠিন হবে। গাজা সংকটের সমাধানই গাজার শিশুরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার একমাত্র পথ।



