যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ বুধবার গাজা অঞ্চলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০‑পয়েন্টের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা ঘোষণা করেন। এই ধাপে গাজায় একটি প্রযুক্তিবিদ (টেকনো‑ক্র্যাটিক) ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠন এবং পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
প্রথম পর্যায়ে অক্টোবর মাসে হামাস ও ইসরায়েল একচেটিয়া যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করে, যার সঙ্গে বন্দি-আদালত বিনিময়, আংশিক ইসরায়েলি প্রত্যাহার এবং মানবিক সাহায্যের বুস্ট অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঐ চুক্তি অনুসারে গাজা সীমিত পরিসরে পুনরুদ্ধার কাজ শুরু হয় এবং কিছু ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়। তবে সেই সময়ের চুক্তি সম্পূর্ণ স্থায়ী শান্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে গাজার সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ, সম্পূর্ণ সামরিকমুক্তি এবং হামাসসহ সব ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্রনিষ্ক্রিয়তা অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে গাজা এখন যুদ্ধবিরতি থেকে সামরিকমুক্তি, প্রযুক্তিবিদ শাসন এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই ধাপের মূল লক্ষ্য গাজাকে পুনরায় বাসযোগ্য করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রত্যাশা করা হয়েছে যে হামাস তার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালন করবে, যার মধ্যে শেষ মৃত ইসরায়েলি বন্দীর দেহ ফেরত দেওয়াও অন্তর্ভুক্ত। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য পরিণতি আরোপের সতর্কতা দেয়া হয়েছে। তাই গাজা অঞ্চলে সামরিকমুক্তি এবং মানবিক দায়িত্বের বাস্তবায়নকে আন্তর্জাতিক চাপের মূল বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের কিছু মূল শর্ত এখনও বিতর্কের মুখে। হামাস পূর্বে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের গঠন ছাড়া অস্ত্র ত্যাগে সম্মত হয়নি, আর ইসরায়েল গাজা থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এই পারস্পরিক অমিল গাজার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে অবশিষ্ট অবিশ্বাস পুনর্নির্মাণের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
যুদ্ধবিরতি এখনও অস্থির অবস্থায় রয়েছে; উভয় পক্ষই একে অপরকে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বোমা হামলায় প্রায় ৪৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা গাজা জনগণের কষ্ট ও মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
জাতিসংঘের মতে গাজার মানবিক অবস্থা এখনো মারাত্মক, যেখানে মৌলিক চিকিৎসা, খাবার এবং জ্বালানির সরবরাহে বাধা রয়েছে। সংস্থা অবিচ্ছিন্নভাবে জরুরি সামগ্রী প্রবাহের মুক্তি দাবি করছে, যাতে বেসামরিক জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। এই মানবিক চ্যালেঞ্জের সমাধান না হলে পুনর্নির্মাণের কাজও থেমে যাবে।
উইটকফের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা গাজাকে যুদ্ধবিরতি থেকে সামরিকমুক্তি, প্রযুক্তিবিদ শাসন এবং পুনর্নির্মাণের পথে নিয়ে যাবে। তিনি বলেন, গাজায় একটি রূপান্তরমূলক প্রযুক্তিবিদ ফিলিস্তিনি প্রশাসন, জাতীয় গাজা প্রশাসন কমিটি (NCAG) গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি গাজার অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্রনিষ্ক্রিয়তা এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের তত্ত্বাবধান করবে।
এই ঘোষণার পর মিশর, তুরস্ক এবং গাজা অঞ্চলের অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যীয় মধ্যস্থতাকারীরা গাজায় গঠিত ‘ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ কমিটি’কে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এই উদ্যোগকে গাজার স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা গাজায় মানবিক সাহায্যের অবাধ প্রবাহ এবং সকল পক্ষের চুক্তি মান্য করার আহ্বান জানিয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের বাস্তবায়ন গাজা ও পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপথে বড় প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যদি গাজা সত্যিকারের সামরিকমুক্তি এবং কার্যকরী প্রযুক্তিবিদ শাসন পায়, তবে এটি ভবিষ্যতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানে নতুন মডেল হতে পারে। অন্যদিকে, শর্তের অমিল এবং মানবিক সংকটের অব্যাহত থাকলে এই পরিকল্পনা ব্যর্থতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।



