বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে কয়েক লাখ কর্মী বিদেশে কাজের সন্ধানে পা বাড়ায়। তবে এই গোষ্ঠীর বেশিরভাগই স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক, যাদের বেতন ও সুবিধা দক্ষ কর্মীর তুলনায় কম। শ্রম ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১,১৩০,৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ২,৩৬,৭৬১ জনকে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে, আর ৪৫,২৩০ জনকে পেশাজীবী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শতকরা হিসেবে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিদেশে গমনকারী কর্মীর ৪ শতাংশ পেশাজীবী, ২২ শতাংশ দক্ষ এবং বাকি ৭৪ শতাংশ স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ। একই ধারা ২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্তও বজায় রয়েছে, যা শ্রম বাজারের গঠনগত সমস্যাকে নির্দেশ করে।
রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) এর বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশ মূলত অর্ধদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল, আর পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা সর্বদা সীমিত। এই পরিস্থিতি প্রশিক্ষণের গুণগত মান, সনদের স্বীকৃতি, বাজেটের ঘাটতি এবং শ্রম রপ্তানিকারক সংস্থার অনিচ্ছার সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে দক্ষ কর্মী তৈরি না হলে দেশের শ্রম রপ্তানি বাজারে স্বতন্ত্র চাহিদা পূরণ কঠিন হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের গুণগত মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, প্রশিক্ষক নিয়োগে মানদণ্ড বৃদ্ধি এবং বাজেটের পর্যাপ্ত বরাদ্দের মাধ্যমে দক্ষ ও পেশাজীবী শ্রমিকের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
বিএমইটি কর্মীদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে: পেশাজীবী, দক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ/অদক্ষ। পেশাজীবী কর্মীর মধ্যে ডাক্তার, প্রকৌশলী, আর্কিটেক্ট, শিক্ষক, হিসাবরক্ষক, কম্পিউটার অপারেটর, ফার্মাসিস্ট, নার্স, ফোরম্যান, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং প্যারামেডিক অন্তর্ভুক্ত। যদিও এই পেশাগুলোর চাহিদা বিদেশি বাজারে উচ্চ, তবু তাদের সংখ্যা মোট শ্রমিকের মধ্যে নগণ্য।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈশিষ্ট্যগুলো কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি করে। প্রথমত, স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের উচ্চ অনুপাত আন্তর্জাতিক নিয়মাবলীর পরিবর্তন বা গন্তব্য দেশের শ্রম নীতি কঠোর হলে রপ্তানি সীমাবদ্ধ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, পেশাজীবী ও দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে বাধা সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, বেতন পার্থক্য ও কাজের শর্তের বৈষম্য শ্রমিকের সন্তুষ্টি হ্রাস করে, যা কর্মসংস্থান স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, দক্ষ ও পেশাজীবী শ্রমিকের অনুপাত বাড়াতে হলে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ কোর্সের মানদণ্ড আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা, সনদপ্রাপ্তি সহজতর করা এবং প্রশিক্ষণ খাতে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, রপ্তানি সংস্থাগুলোর জন্য প্রণোদনা ব্যবস্থা তৈরি করে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা পূরণে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা বিবেচনা করলে, গ্লোবাল শ্রম বাজারে উচ্চ দক্ষতা ও বিশেষায়িত পেশা অধিক মূল্যায়িত হবে। তাই বাংলাদেশ যদি দক্ষ ও পেশাজীবী শ্রমিকের অংশ বাড়াতে পারে, তবে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা উন্নত হবে। অন্যদিকে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শ্রম রপ্তানির ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং দেশীয় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাধা সৃষ্টি করবে।
সংক্ষেপে, ২০২৫ সালের তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে বিদেশে কাজ করা বাংলাদেশের শ্রমিকের অধিকাংশই স্বল্পদক্ষ। এই কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে প্রশিক্ষণ গুণগত মান, সনদের স্বীকৃতি ও বাজেটের যথাযথ বরাদ্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধুমাত্র তখনই দক্ষ ও পেশাজীবী শ্রমিকের অংশ বাড়িয়ে দেশের শ্রম রপ্তানি বাজারকে টেকসই করা সম্ভব হবে।



