বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে; আয় বৈষম্য বাড়ছে, সামাজিক বিভাজন তীব্রতর হচ্ছে, গণতন্ত্রের মান হ্রাস পাচ্ছে এবং পরিবেশগত সংকট ত্বরান্বিত হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রভাব কমে যাচ্ছে, কারণ দেশগুলো জাতীয় স্বার্থ ও শক্তি-রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে। এই প্রবণতা এককালীন ঝড় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষণ, যা প্রাচীন লিবারাল পুঁজিবাদ থেকে নতুন ধরনের ফিউডাল পুঁজিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
নতুন এই কাঠামোকে ‘নিওফিউডালিজম’ বলা হয়, যেখানে বাজারের আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণের হ্রাস, আর্থিক শৃঙ্খলাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের বিস্তার মূল বৈশিষ্ট্য। এই মডেলটি বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ওপর ঝুঁকি স্থানান্তর করে, মুনাফা কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা ও স্থানীয় বড় ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প এই প্রবণতার স্পষ্ট উদাহরণ। ১৯৯০-এর দশক থেকে দেশটি রপ্তানি-কেন্দ্রিক পোশাক উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যেখানে বিদেশি মূলধন, কম মজুরি এবং দুর্বল শ্রম সুরক্ষা মূল চালিকাশক্তি। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে যাওয়া দুর্ঘটনা এই মডেলের মানবিক দিক উন্মোচন করে; নিয়ন্ত্রিত না হওয়া সরবরাহ শৃঙ্খল শ্রমিকদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, আর মুনাফা বহুজাতিক ও দেশীয় সাবকন্ট্রাক্টরদের মধ্যে ভাগ হয়।
ইন্ডিয়ার অর্থনৈতিক রূপান্তরও একই ধারা অনুসরণ করেছে। ১৯৯০-এর শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সমর্থনে গৃহীত কাঠামোগত সমন্বয় নীতি, রাষ্ট্রের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণ, বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগের উৎসাহ প্রদান করেছে। যদিও এই নীতি দেশের মোট দেশীয় উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এনেছে, তবে বৃদ্ধির সুবিধা সমানভাবে বিতরণ হয়নি; অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা হ্রাস পেয়েছে এবং আয়-সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। ২০১৪ সালের পর সরকারী নীতি আরও বড় বেসরকারিকরণ প্রকল্প চালু করে, যা বাজারের নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ধনী বেলগারদের সম্পদের সঞ্চয় ও রাজনৈতিক প্রভাবের বৃদ্ধি এই নতুন কাঠামোর আরেকটি দিক প্রকাশ করে। উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের আর্থিক ক্ষমতা নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক নিয়মের পুনর্গঠনে সহায়তা করে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির শাসন কাঠামোতে ধনী গোষ্ঠীর প্রাধান্য স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, যা পূর্বের লিবারাল পুঁজিবাদের তুলনায় অধিক কেন্দ্রীভূত এবং হায়ারার্কিকাল বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।
এই তিনটি দেশের উদাহরণ দেখায় যে, বাজারের মুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের হ্রাসের ফলে শ্রমিকের নিরাপত্তা হ্রাস পায়, আর মুনাফা কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া নীতি গঠনে সহায়তা করে।
ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শৃঙ্খলাকে পুনর্গঠন করতে পারে; অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায়ও অনুরূপ কেন্দ্রীয়করণ দেখা যাবে। ফলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা আরও জটিল ও অস্থির হতে পারে, যেখানে সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য নতুন কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হবে।



