নড়াইলে সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের চাকই গ্রামে বুধবার বিকেলে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় উদ্যোগে পৌষ মাসের শেষ দিনে আয়োজিত এই ইভেন্টে হাজারো মানুষ সমবেত হয়ে গ্রামবাংলার প্রাচীন খেলাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে অংশ নেয়। অনুষ্ঠানটি গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক মেলায় রঙিন পরিবেশের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে।
সকাল থেকে মাঠে নারী, পুরুষ এবং বিভিন্ন বয়সের শিশু সমাবেশ করে। গাছের ছায়া ও মাটির গন্ধের মাঝে ভিড়ের স্রোত অব্যাহত থাকে, যেখানে প্রত্যেক দর্শক ঘোড়ের দৌড় এবং সওয়ারদের কৌশল পর্যবেক্ষণ করতে চায়। দৌড়ের শুরুতে তালি ও উল্লাসের শব্দ পুরো মাঠে ছড়িয়ে পড়ে, যা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলার স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
প্রতিযোগিতায় মোট বারোটি ঘোড়া অংশগ্রহণ করে, প্রত্যেকের সওয়ার নিজস্ব রণকৌশল প্রয়োগ করে দৌড়ে উত্তেজনা বাড়ায়। ঘোড়াগুলো দ্রুত গতি অর্জন করে মাঠের চারপাশে দৌড়ে, আর সওয়ারদের চাতুর্য ও সমন্বয় দর্শকদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে। দৌড়ের সময় দর্শকরা বসে বা দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাসের সাথে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করে।
বিছালী গ্রামের রেজাউল ইসলাম জসিম উল্লেখ করেন, আধুনিকায়নের ফলে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে, তবে চাকই এলাকায় এখনও এই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা প্রতি বছর স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠান গ্রাম্য সংস্কৃতির সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঘোড়দৌড়ের পাশাপাশি তিন দিনব্যাপী পৌষ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, মেলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জারিগান এবং শুক্রবারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি যোগ করেন, এই ধারাবাহিকতা গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষা, বিনোদন প্রদান এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সহায়ক হবে।
বিছালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, এই ইভেন্টের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে বিনোদন দেওয়া এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও খেলাধুলা সংরক্ষণ করা। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতি বছর চাকই এলাকায় এই ধরনের আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা ও গর্বের অনুভূতি জাগায়।
কমিটির সদস্য মোরাদ হোসেন শেখ উল্লেখ করেন, এই বছরও বিভিন্ন বয়সের অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন, যেখানে নারী, পুরুষ ও শিশুদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে চোখে পড়ে। তিনি বলেন, এই বৈচিত্র্য ঘোড়দৌড়কে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি তরুণকে আকৃষ্ট করবে।
যশোরের অভয়নগর থেকে আসা মুহিম বলেন, তিনি প্রতি বছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। তিনি যোগ করেন, ঘোড়দৌড়ের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে স্মরণ করা যায় এবং তা দেখার আনন্দ অপরিসীম।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অংশগ্রহণকারীরা একমত যে ঘোড়দৌড়ের ধারাবাহিকতা গ্রাম্য সংস্কৃতির পুনর্জীবনে সহায়ক। অনুষ্ঠানটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামবাসীর সামাজিক মেলবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
আসন্ন বছরগুলোতেও একইভাবে ঘোড়দৌড় ও পৌষ মেলার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা যায় এবং স্থানীয় পর্যটন ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বাড়ে।



