২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে মাজার বা সুফি সাধকদের দরবারে কমপক্ষে ছয়ষট্টি হামলার রেকর্ড পাওয়া গেছে। এই আক্রমণগুলো ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং জমি দখলের উদ্দেশ্যে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে পরিচালিত হয়েছে। ফলে দুইজনের মৃত্যু এবং দুইশতাধিক মানুষ, যার মধ্যে নারীরাও অন্তর্ভুক্ত, আহত হয়েছেন।
মাকাম – সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের ডিসেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশব্যাপী মাজার‑কেন্দ্রিক মোট প্রায় একশ পঞ্চাশটি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে ২০২৪‑২০২৫ সালে মোট পঞ্চাশটি মাজার‑সংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে তেতাল্লিশটি নিশ্চিত হামলা হিসেবে স্বীকৃত। বাকি ঘটনাগুলো গুজব বা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত। জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় নরসিংদিতে একাদশটি, ঢাকা জেলায় নয়টি, নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি, কিশোরগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে প্রত্যেকটি তিনটি, আর শরীয়তপুর ও গাজীপুরে দুটো করে ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে একই সময়ে সাতাশটি নিশ্চিত মাজার‑হামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে কুমিল্লা জেলায় এককেন্দ্রিক সতেরোটি আক্রমণ ঘটেছে, যা বিভাগীয় মোটের অর্ধেকের বেশি। চট্টগ্রাম শহরে চারটি, নোয়াখালীতে তিনটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুটো ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে সংঘটিত এই হামলাগুলো জাতীয় পরিসংখ্যানের প্রায় বিশ শতাংশ গঠন করে।
হামলার পরিণতিতে অন্তত বারোটি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়ে গেছে এবং পনেরোটি মাজারের বার্ষিক উর্সের আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে। নারীদের সহ অন্তত একত্রিশজন আহত হয়েছে, যার মধ্যে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
মহামারী‑পরবর্তী সময়ে মাজারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। পুলিশ দলগুলো সংশ্লিষ্ট জেলায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং অপরাধীর সনাক্তকরণে ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্য সংগ্রহের কাজ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মোহাম্মদ রোমেল, যিনি এই বিষয়ের বিশ্লেষক ও লেখক, উল্লেখ করেন যে মাজার‑সংক্রান্ত গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ধারাবাহিক আক্রমণ শুরু হয়। তিনি বলেন, সরকারকে সময়মতো শক্তিশালী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বলা সত্ত্বেও কোনো দৃঢ় নীতি গৃহীত হয়নি। একই সঙ্গে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—বিএনপি, জামাত ও এনসিপি—ও এই সমস্যায় স্পষ্ট বা কঠোর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
রোমেল আরও যুক্তি দেন, দুর্বল সরকার ও অপর্যাপ্ত আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এই ধরনের সহিংসতার পটভূমি তৈরি করেছে। তিনি দাবি করেন, যদি রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটি শক্তিশালী অবস্থান নিত, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের মতে, মাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তা গার্ড ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এছাড়া, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সুরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অধিকন্তু, মাজার‑হামলার শিকারদের জন্য চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা প্রদান করতে সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আক্রমণ রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, এটাই বর্তমান নীতি নির্দেশনা।



