নিউ ইয়র্কের শিপিং টেক কোম্পানি Bluspark Global-র সরবরাহ চেইন প্ল্যাটফর্ম Bluvoyix-এ গুরুতর সাইবার নিরাপত্তা ত্রুটি প্রকাশ পায়, যা ইন্টারনেটের যে কোনো ব্যবহারকারীকে গ্রাহকদের শিপমেন্ট রেকর্ডে প্রবেশের সুযোগ দেয়। এই ত্রুটি প্রকাশের ফলে দশকের পর দশক ধরে সঞ্চিত ডেটা অনিরাপদ হয়ে দাঁড়ায়।
গত এক বছর ধরে সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা বিশ্বব্যাপী লজিস্টিকস শিল্পকে হ্যাকিং ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। হ্যাকারদের দ্বারা পরিচালিত চুরি ও পুনঃনির্দেশনা ঘটনার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভ্যাপের ডেলিভারি ট্রাক, লবস্টার কন্টেইনার ইত্যাদি লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
Bluspark Global, যদিও ভোক্তাদের কাছে পরিচিত নয়, তবে তার সফটওয়্যার শত শত বড় কোম্পানির পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। রিটেইল চেইন, মুদি দোকান, ফার্নিচার নির্মাতা এবং অন্যান্য বহু সংস্থা এই প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। ফলে, একক সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিলে সারা বিশ্বে শিপমেন্টের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বিপন্ন হয়।
গবেষকরা অক্টোবর মাসে Bluspark-এ পাঁচটি মূল ত্রুটি সনাক্ত করেন। প্রথমটি ছিল কর্মচারী ও গ্রাহকদের পাসওয়ার্ড সরল টেক্সটে সংরক্ষণ করা, যা এনক্রিপশন ছাড়া সহজে পড়া যায়। দ্বিতীয় ত্রুটি ছিল দূরবর্তীভাবে সফটওয়্যারে প্রবেশের অনুমতি, যার মাধ্যমে অননুমোদিত ব্যবহারকারী সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারত। বাকি ত্রুটিগুলোও ডেটা এক্সপোজার ও অপ্রয়োজনীয় অ্যাক্সেসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছিল।
এই ত্রুটিগুলো প্রকাশের পর Bluspark Global দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সংশোধন কাজ সম্পন্ন করে। কোম্পানি জানায় যে সব পাঁচটি দুর্বলতা এখন বন্ধ করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ত্রুটিগুলো প্রকাশের সময় গ্রাহকদের তথ্য বহু বছর আগে থেকে সংরক্ষিত রেকর্ডসহ উন্মুক্ত ছিল, যা ডেটা গোপনীয়তার দৃষ্টিতে বড় উদ্বেগের বিষয়।
সিকিউরিটি গবেষক Eaton Zveare-ই প্রথমে এই দুর্বলতাগুলো শনাক্ত করেন। ত্রুটি প্রকাশের পর কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্পষ্ট কোনো চ্যানেল না থাকায় তিনি তথ্য পাঠাতে সময় ব্যয় করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি ব্লগ পোস্টে বিশদ বিবরণ শেয়ার করেন, যেখানে সমস্যার প্রকৃতি ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
Bluspark Global-র এই ঘটনা লজিস্টিকস সেক্টরে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বকে আবারও তুলে ধরেছে। শিপিং ডেটা শুধুমাত্র পণ্যের গতি নয়, বরং সরবরাহ চেইনের আর্থিক ও কাস্টমার রিলেশনশিপের মূল অংশ। একবার ডেটা ফাঁস হলে তা চুরি, জালিয়াতি এবং গ্রাহকের বিশ্বাস হারানোর দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাপী শিপিং কোম্পানি এখন নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করছে। এনক্রিপশন, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং নিয়মিত প্যাচ ম্যানেজমেন্টকে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তাছাড়া, সাইবার থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হ্যাকিং প্যাটার্ন দ্রুত সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
এই ধরনের ত্রুটি প্রতিরোধে শিল্পের অভ্যন্তরে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। গবেষকরা উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত আপডেট নয়, কর্মীদের সাইবার সচেতনতা প্রশিক্ষণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
Bluspark Global-র ক্ষেত্রে দেখা যায়, ত্রুটি সনাক্তের পর দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হলেও, ত্রুটি প্রকাশের আগে গ্রাহক ডেটা কতদিন অনিরাপদ ছিল তা স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চয়তা শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যাতে ভবিষ্যতে ত্রুটি সনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন ও যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
সামগ্রিকভাবে, শিপিং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য সাইবার নিরাপত্তা আর বিকল্প নয়, বরং ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডেটা লিকের ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি, আইনি দায়বদ্ধতা এবং ব্র্যান্ডের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, নিরাপত্তা মানদণ্ডকে আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত করে সবার জন্য নিরাপদ সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা জরুরি।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, সাইবার হুমকি শুধুমাত্র তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানির নয়, শিপিং ও লজিস্টিকস সেক্টরের প্রতিটি সংস্থার জন্য সমানভাবে হুমকি। ত্রুটি সনাক্তের পর দ্রুত পদক্ষেপ, স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং ধারাবাহিক নিরাপত্তা আপডেটই ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের মূল চাবিকাঠি।



