২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনের আগে মাত্র দুই বছর বাকি, তবে মাঠের প্রস্তুতির চেয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তেজনা বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির ফলে বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহ-আয়োজক হওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে দেশটিকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২৩জন সংসদ সদস্য। লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি এবং প্লাইড কামরু পার্টির এই প্রতিনিধিরা এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান না দেখানোর কারণে তাকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট থেকে বাদ দেওয়া উচিত বলে দাবি করেছেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “বিশ্বকাপ বা অলিম্পিক কোনো রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের হাতিয়ার হতে পারে না”। এ ধরনের অবস্থান নেওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রভাব রয়েছে।
মার্চ মাসে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর একটি হঠাৎ অভিযান চালিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এই পদক্ষেপকে আইনগত অভিযান বলে দাবি করেছে, তবে মাদুরোকে “অবৈধ নেতা” এবং মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত বলে ট্রাম্পের মন্তব্যে তীব্র সমালোচনা উত্থাপিত হয়েছে।
এছাড়াও, ট্রাম্পের সরকার গ্রিনল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক হুঁশিয়ারি জানিয়েছে। এই দেশগুলো ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক বা অংশগ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখিত, ফলে তাদের প্রতি সম্ভাব্য সামরিক হুমকি ক্রীড়া ইভেন্টের নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা ট্রাম্পকে “শান্তি পুরস্কার” প্রদান করে। ফিফার এই স্বীকৃতি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা এবং নাইজেরিয়ায় সামরিক অভিযান চালায়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানকে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনা ও মানবিক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। যদিও হোয়াইট হাউস এখনও কোনো মন্তব্য করেনি, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার অভিযানকে আইনগত ও নিরাপত্তা রক্ষার উদ্যোগ বলে যুক্তি দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংসদের ২৩জন এমপি এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টকে রাজনৈতিক দমনমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ক্রীড়া ইভেন্টের মূল উদ্দেশ্য হল ন্যায়পরায়ণতা, বন্ধুত্ব ও শান্তি বজায় রাখা, যা কোনো দেশের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের পটভূমিতে ট্রাম্পের ধারাবাহিকভাবে রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশের বিরোধী নীতি রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি চলাকালীন এই ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রীড়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। ফিফা ও আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এখনো এই দাবিগুলোর প্রতি কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, তবে ভবিষ্যতে কীভাবে এই বিষয়টি পরিচালিত হবে তা নজরে থাকবে।
ব্রিটিশ সংসদের এই যৌথ বিবৃতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান না দেখানো দেশকে কোনো বড় ক্রীড়া ইভেন্টে অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছে।
অবশেষে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এখনও হোয়াইট হাউসে থেকে এই বিষয়ের উপর কোনো স্পষ্ট মন্তব্য দেয়নি। তবে তারা মাদুরোর আটককে আইনগত অভিযান হিসেবে রক্ষা করে, এবং ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী মাদুরোকে অবৈধ নেতা ও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেছে।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে ক্রীড়া ও রাজনীতির সীমা কোথায় তা পুনরায় নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর নিরাপত্তা ও নীতিগত অবস্থান কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।



