গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বুধবার বিকেলে ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণমাধ্যম সংস্কার: বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখ করেন, কমিশনের সুপারিশের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর যে আক্রমণ ঘটেছে তার সম্পূর্ণ দায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। তিনি বলেন, কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ঠিক ৮ মাস ২৮ দিন পর, তিনি যে সংবাদপত্রে (ডেইলি স্টার) কাজ করেন সেই ভবনে আগুন লাগিয়ে ২৮ জন সাংবাদিককে মারার চেষ্টা করা হয়েছে এবং দমকল বাহিনীর কাজ বাধা দেওয়া হয়েছে।
কামাল আহমেদ উল্লেখ করেন, ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটার পর থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি। তিনি বলেন, যদি ওই আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটত, তবে তিনি নিজেও একই বিপদের মুখে পড়তে পারতেন। এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং সরকারের অক্ষমতা নিয়ে তিনি তীব্র প্রশ্ন তোলেন।
আলোচনায় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কিছু ব্যক্তির মন্তব্যের ফলে সাংবাদিকদের ওপর হুমকি ও আক্রমণ বাড়ছে। যদিও কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি কোনো মিডিয়া আউটলেট বা সাংবাদিককে আক্রমণ করার আদেশ দেয়নি, তবু ইউটিউবারদের অযৌক্তিক মন্তব্যের ফলে পরিস্থিতি তীব্রতর হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কামাল আহমেদ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সুসাংবাদিকতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বাধা সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেন। তিনি ‘মবের ভয়’কে বর্তমান স্বাধীন সাংবাদিকতার সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলছেন, স্বচ্ছ ও স্বতন্ত্র তদারকি সংস্থা না থাকলে মিডিয়া সংস্কার কার্যকর করা কঠিন।
সেমিনারটি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এবং এতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউ) সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান, জি-৯–এর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কাজী জেসিন, ইরাবতীর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মো. মুক্তাদির রশীদ এবং এনএইচকে টিভির বাংলাদেশ প্রতিনিধি পারভীন এফ চৌধুরীসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অংশগ্রহণ করেন।
অংশগ্রহণকারীরা সাংবাদিক নিরাপত্তা, মিডিয়া সংস্কারের বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ নীতিমালা নিয়ে মতবিনিময় করেন। বেশিরভাগই একমত যে সরকারকে মিডিয়া আক্রমণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগে ত্বরান্বিত হতে হবে। এছাড়া, মিডিয়া কর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন এবং স্বাধীন তদারকি সংস্থার গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার বলে সম্মত হয়েছেন উপস্থিত সবাই।
কামাল আহমেদ শেষ পর্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং সরকারকে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে স্বাধীন ও স্বচ্ছ মিডিয়া পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার।
এই আলোচনার পর মিডিয়া সংস্থাগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানায়, যাতে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ বন্ধ হয়ে সত্যিকারের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।



