কক্সবাজারের তেজি সেতু এলাকায় বসবাসরত ৯ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান, গত রবিবার মিয়ানমারের সীমান্তে সংঘটিত গুলিবর্ষণ থেকে বেঁচে থাকা এক গুলির আঘাতে গলা ভেতরে গুলি আটকে যাওয়ায় গুরুতর অবস্থায় ঢাকা জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ও হাসপাতাল (এনআইএনএস) এর তীব্র সেবা ইউনিটে ভর্তি হয়েছে। গুলি আঘাতের ফলে মেয়ের মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেয় এবং মস্তিষ্কের চাপ বেড়ে যাওয়ায় তাকে যান্ত্রিক শ্বাসযন্ত্রে (মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর) যুক্ত করা হয়েছে।
মেয়ের তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুরু হয়, তবে গুলি গলা থেকে বের করা সম্ভব না হওয়ায় তাকে রাতারাতি ঢাকা এনআইএনএসে স্থানান্তর করা হয়। এনআইএনএসের সহকারী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হিমু জানান, গুলি এখনও গলা ভেতরে আটকে আছে এবং রক্তনালীর ক্ষতির ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ায় স্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। মস্তিষ্কের চাপ কমাতে ওষুধ প্রদান করা হয়েছে এবং শ্বাসযন্ত্রের সহায়তায় রোগীর জীবন রক্ষা করা হচ্ছে।
চিকিৎসা দলের মতে, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে এখনো সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা কঠিন। তবে রোগীর কিছু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে, যা দুইটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মস্তিষ্কের চাপ কমে গেলে পরবর্তী শল্যচিকিৎসা করা হতে পারে, তবে তা এখনও অনিশ্চিত।
এনআইএনএসের পরিচালক প্রফেসর কাজি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ বোর্ড রোগীর চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমানে রোগীকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। রোগীর চাচা শাওকাত আলি এবং চিকিৎসা দল একসাথে রোগীর অবস্থা নিয়ে আলোচনা করছেন এবং সর্বোচ্চ যত্ন প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
হুলিয়ান গুলিবর্ষণটি মিয়ানমারের আরাকান সেনাবাহিনী ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের সময় ঘটেছে বলে জানা যায়। গুলির উৎস মিয়ানমার থেকে আসা বলে অনুমান করা হচ্ছে, তবে গুলির সঠিক দিক ও দায়িত্বশীল পক্ষ নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুলিবর্ষণের আন্তর্জাতিক দিক নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উন্মোচনের চেষ্টা করছে। গুলির উৎস ও দায়িত্বশীলতা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত, এই ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটার জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উত্থাপিত হয়েছে।
এদিকে, রোগীর পরিবার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের স্রোত চলছে। হুজাইফা আফনানের পরিবার তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে এবং চিকিৎসা সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও রোগীর পাশে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছে।
গুরুতর আঘাতের পরেও রোগীর বয়স ও শারীরিক শক্তি কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসা দল রোগীর শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা বজায় রেখে, মস্তিষ্কের চাপ কমাতে ওষুধের ডোজ সামঞ্জস্য করে চলেছে। রোগীর অবস্থা উন্নত হলে শল্যচিকিৎসা পরিকল্পনা করা হবে, তবে তা মস্তিষ্কের চাপ কমে যাওয়ার পরই সম্ভব হবে।
এই ঘটনার পর, স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গুলিবর্ষণের দায়িত্বশীলদের সনাক্ত করার জন্য তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। গুলির উৎস, গুলি চালানোর পদ্ধতি এবং সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, গুলিবর্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চিহ্নিত হয়ে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
গল্পটি আন্তর্জাতিক সীমান্তে সংঘটিত গুলিবর্ষণের মানবিক দিককে তুলে ধরছে, যেখানে নিরীহ নাগরিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। হুজাইফা আফনানের মতো শিশুরা এই ধরনের সংঘর্ষের শিকার হয়ে তাদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে। তাই, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার দিক থেকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোর দেওয়া হচ্ছে।
এখনো রোগীর অবস্থা তীব্র, তবে চিকিৎসা দল সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রোগীর পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে।



