পৌষের শেষ দিন, যা ঐতিহ্যগতভাবে পুরনো ঢাকায় রঙিন ঘুড়ি, পিঠা ও গানের সুরে ভরে উঠত, এই বছর তুলনামূলকভাবে নীরবভাবে পার হয়েছে। শাকরিবাজার, সুত্রাপুর, গন্ধারিয়া, নারিন্দা, কাগজিটোলা ও লক্ষ্মীবাজারের ঘুড়ি দোকানগুলোতে বিক্রির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এই এলাকাগুলোর ঘুড়ি বিক্রেতারা জানান, গত বছর তুলনায় বিক্রয় কমে যাওয়ার কারণ বিভিন্ন, তবে সরাসরি বিক্রয় সংখ্যা হ্রাসই প্রধান উদ্বেগের বিষয়। শাকরিবাজারের এক বিক্রেতা উল্লেখ করেন, “বছরের শেষ দিনে বিক্রি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে।” লক্ষ্মীবাজারের আরেকজন বিক্রেতা একই রকম হতাশা প্রকাশ করে, “সাকরাইনের উচ্ছ্বাস আর দেখা যায় না।”
সকালের সময় কিছু ঘুড়ি আকাশে দেখা গেল, তবে বিকালের দিকে আকাশ নিঃশব্দে রইল। সন্ধ্যায় আগুনের শিখা, বাতি ও সঙ্গীতের গুঞ্জন ঘুড়ি উড়ানোর ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে গিয়েছে। স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, “আগে পুরো আকাশ ঘুড়িতে ভরে থাকত, এখন সাকরাইন মানে ডি.জে. পার্টি আর আতশবাজি।”
সাকরাইন শুধুমাত্র একদিনের অনুষ্ঠান নয়; এটি পুরনো ঢাকার স্মৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঐতিহ্যগতভাবে মানুষ ঘরে পিঠা তৈরি করে, ছাদে ঘুড়ি উড়িয়ে ঘুড়ি-লড়াই করে আনন্দ ভাগ করে নিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রথা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে, যা বিক্রয় হ্রাসের পাশাপাশি উদযাপনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে।
একজন গন্ধারিয়ার বাসিন্দা, যিনি নাম প্রকাশ না করতে চেয়েছেন, জানান, “শৈশব থেকে সাকরাইন আমাদের জীবনের অংশ ছিল, কিন্তু এখন সেই উত্সবের আত্মা হারিয়ে যাচ্ছে।” কল্পবাজারের এক শিক্ষার্থীও একই উদ্বেগ ভাগ করে, “এভাবে চলতে থাকলে সাকরাইন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে পারে।”
পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নজর দিচ্ছে। সহকারী কমিশনার ফজলুল হক উল্লেখ করেন, সাকরাইন উদযাপনের সময় জনসাধারণের নিরাপত্তা বজায় রাখতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আতশবাজি ও বড় আকারের লণ্ঠন ব্যবহারকারী অংশগ্রহণকারীদের জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিক্রয় হ্রাস, আকাশের নীরবতা এবং উদযাপনের পদ্ধতির পরিবর্তন একসাথে সাকরাইনের ঐতিহ্যগত রূপকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদিও কিছু অংশে আধুনিক সঙ্গীত ও আলো-আলোয় উৎসবের রঙ যোগ হয়েছে, তবু পুরনো ঢাকার বাসিন্দারা মনে করেন, এই পরিবর্তন ঐতিহ্যের মূল সত্তাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা উভয়ই আশা প্রকাশ করছেন, ভবিষ্যতে ঘুড়ি উড়ানোর পুনরুৎথান এবং পিঠা তৈরির ঐতিহ্যকে পুনরায় জীবন্ত করা সম্ভব হবে। তারা প্রস্তাব করছেন, স্কুল ও কমিউনিটি কেন্দ্রগুলোতে ঘুড়ি উড়ানোর কর্মশালা এবং পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত।
সাকরাইন এখনও পুরনো ঢাকার সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে তার রূপান্তর এখনো চলমান। শহরের বিভিন্ন কোণায় এই পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন, তবে সবাই একমত যে, ঐতিহ্যবাহী উপাদানগুলোকে সংরক্ষণ করা এবং আধুনিক উপাদানের সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি।
সাকরাইনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কতটা সমন্বিত প্রচেষ্টা করা হবে, যাতে ঘুড়ি, পিঠা ও সঙ্গীতের ঐতিহ্য একসাথে বজায় থাকে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এই উৎসবের আনন্দ পুনরায় উজ্জ্বল হয়।



