ইরানের রাজধানী তেহরানে গত সপ্তাহের শেষের দিকে বিক্ষোভের তীব্রতা হ্রাস পেয়ে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতা ও সহিংসতা ধীরে ধীরে কমে গিয়েছে, এবং এখন শহরের প্রধান সড়ক ও পাবলিক স্থানগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবারের পর থেকে রাস্তায় প্রতিবাদকারী দলের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে, নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপের মাত্রা কমে গেছে। পূর্বে কয়েক দিন ধরে চলা ধাক্কা‑ধাক্কি, গুলিবিদ্ধি ও ধ্বংসের ঘটনা এখন বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।
সেই একই দিনে, সরকার‑পক্ষের একটি বিশাল সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। সোমবার অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে তেহরানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নাগরিকরা একত্রিত হয়ে সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা সরকারকে ‘সবুজ সংকেত’ হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং এই সমাবেশকে দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
সরকারের নেতৃত্ব এই বৃহৎ সমাবেশকে ‘দাঙ্গাবাজ’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। নিরাপত্তা সংস্থা এখন থেকে আরও তীব্র নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যাতে কোনো অস্থিরতা পুনরায় উত্থাপিত না হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক মন্তব্যের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মন্তব্যের পর জনগণের মধ্যে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা সামাজিক উত্তেজনা পুনরুজ্জীবিত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি উল্লেখ করেছেন, গত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় কোনো বিক্ষোভের চিহ্ন দেখা যায়নি এবং কোনো দাঙ্গা ঘটেনি। তিনি বলেন, “আমি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কোনো প্রতিবাদ বা হিংসাত্মক ঘটনার নজর পাইনি।” তার এই মন্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির শান্তি নিশ্চিত করার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইজাদি ইন্টারনেটের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণকে নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য হুমকি সনাক্ত করা এবং তা প্রতিহত করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” ফলে কিছু সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যা নিরাপত্তা সংস্থার কাজকে সহজতর করে।
অধিকন্তু, তিনি গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। সেই সময়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কিছু সদস্য ইরানের অবকাঠামো ব্যবহার করে যোগাযোগ চালাত এবং একটি কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার পরিচালনা করত। পরে এই কেন্দ্রটি হামলার সময় শনাক্ত হয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে আসে।
ইজাদি আরও দাবি করেন, বিক্ষোভের সময়ে কিছু ‘দাঙ্গাবাজ’ পুলিশ সদস্য এবং দোকানদারদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। বিশেষ করে যারা দোকান বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি দাঙ্গাবাজরা দোকানদারদের হত্যা করেছে।” এই তথ্যগুলো নিরাপত্তা সংস্থার তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবারের সকাল থেকে সরকার‑পক্ষের সমাবেশ ও মিছিলের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এই প্রবণতা নিরাপত্তা বাহিনীর রিপোর্টে প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে এখন পর্যন্ত কোনো বড় আকারের সহিংসতা ঘটেনি।
বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সহিংসতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, বর্তমান শান্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে, কারণ জনমত ও আন্তর্জাতিক চাপের প্রভাব এখনও অবশিষ্ট।
ভবিষ্যতে সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে, অনলাইন নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে পারে এবং ‘দাঙ্গাবাজ’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সঙ্গে, জনসাধারণের মধ্যে অব্যাহত উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তুলবে, যা পরবর্তী সপ্তাহে কীভাবে বিকশিত হবে তা এখনও অনির্ধারিত।



