ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান একত্রে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই তিনটি আরব দেশ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর কোনো আক্রমণ পরিকল্পনা হলে তা কেবল ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, রিয়াদে শুরু হওয়া এই কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছে। বিশাল তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এই দেশটি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ফলে তার তেল রপ্তানি ও রিফাইনিং শিল্পে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
সৌদি আরবের উদ্বেগের আরেকটি স্তর হল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা লক্ষ্য করে কোনো সামরিক অভিযান ঘটলে, তা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে। তাই রিয়াদে কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার উচ্ছেদে হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অঞ্চলের আরেকটি কৌশলগত উদ্বেগ হল হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা। হরমুজের সংকীর্ণ জলপথের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মোট তেল রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রবাহিত হয়। ইরানের ওপর সামরিক আক্রমণ হলে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। এই ঝুঁকি আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের ওঠানামা এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা উভয়কেই প্রভাবিত করবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে ইরান ইস্যুতে সম্ভাব্য উত্তেজনার জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করা হয়েছে। এই সতর্কবার্তা রিয়াদ, দোহা এবং মাস্কাটের মতো রাজধানীগুলিতে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দেশগুলো জোর দিয়ে বলেছে যে, কোনো সামরিক সংঘাত জ্বালানি নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান স্পষ্টভাবে হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছে যে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার উচ্ছেদের কোনো প্রচেষ্টা তেল বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই অবস্থানটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে।
একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে হরমুজের মাধ্যমে তেল প্রবাহে বাধা পড়লে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিশাল ধাক্কা দিতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “সৌদি, কাতার ও ওমানের কূটনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে, যাতে কোনো হিংসাত্মক পদক্ষেপের আগে রাজনৈতিক সমাধানের পথ অনুসন্ধান করা হয়।”
এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিরা রিয়াদে, দোহা ও মাস্কাটে অনুষ্ঠিত কূটনৈতিক মিটিংয়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার জন্য যৌথ বিবৃতি প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, গ্লোবাল এনার্জি ফোরাম এবং আন্তর্জাতিক তেল সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর কথাও আলোচনা হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর সামরিক আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে লক্ষ্য রাখে। এই পদক্ষেপের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক তেল বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার বহুস্তরীয় উদ্বেগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এই দেশগুলোর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার ফলাফলই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে।



