ঢাকার গুলশান এভিনিউতে সিটি ব্যাংক ২০ কাঠা জমি অতিরিক্ত মূল্যে ক্রয় করে উচ্চমহল নির্মাণের পরিকল্পনা চালু করেছে। ব্যাংকটি একই প্রকল্পে পূর্বে ক্রয় করা ২০ কাঠা জমির সঙ্গে মিলিয়ে মোট ৪০ কাঠা জমিতে ২৮তলা ভবন গড়ে তুলবে। এই উদ্যোগের মোট ব্যয় ১২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি, যার মধ্যে জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণের খরচ অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটি প্রতি কাঠা প্রায় ১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায় জমি কিনেছে, যা একই এলাকায় বর্তমান বাজারমূল্য থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেশি। গুলশান এভিনিউতে একই ধরণের বাণিজ্যিক জমি সাধারণত আট কোটি টাকার কাছাকাছি দামে লেনদেন হয়। স্থানীয় রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের মতে, এই উচ্চমূল্য ক্রয় পার্শ্ববর্তী জমি ও ভবন মালিকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং বাজারে অস্বাভাবিকতা তৈরি করতে পারে।
সিটি ব্যাংক মোট ৪০ কাঠা জমিতে ২৮তলা ভবন নির্মাণের জন্য ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয় অনুমান করেছে, আর জমি ক্রয় ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য অতিরিক্ত এক হাজার দুইশো কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ইতিমধ্যে প্রাপ্ত হয়েছে। অনুমোদন সত্ত্বেও, উচ্চমূল্য জমি ক্রয়ের ফলে ব্যাংকের ব্যয় কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
সিটি ব্যাংক ১৯৮৩ সালে ১২জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে গঠিত হয় এবং ১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটি মূলত খুচরা ও কর্পোরেট সেবা প্রদান করে আসছে এবং দেশের অন্যতম বড় বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চমূল্য সম্পদ ক্রয় ও বিশাল নির্মাণ প্রকল্পের ফলে তার মূলধন কাঠামো ও ঝুঁকি প্রোফাইল পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম উল্লেখ করেছেন, বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দরে জমি ক্রয় করা হলে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বিক্রেতা প্রকৃতপক্ষে কত টাকা পেয়েছেন, জমির ন্যায্য মূল্য কত হওয়া উচিত এবং কোনো দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা তদন্তের আওতায় থাকবে। এই মন্তব্যের পর থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের সম্ভাবনা বাড়ছে।
বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ব্যাংকের এই অতিরিক্ত ব্যয় তার মুনাফা মার্জিনকে সংকুচিত করতে পারে। উচ্চ মূলধন ব্যয় শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত রিটার্ন কমিয়ে দিতে পারে। তদুপরি, ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তার মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (CAR) কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে আসতে পারে।
ডিপোজিটারদের জন্যও এই পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ। ব্যাংকের সম্পদে অতিরিক্ত অ-উৎপাদনশীল ব্যয় যুক্ত হলে, আমানতকারীদের ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে, যদি ভবন নির্মাণের সময়সূচি বিলম্বিত হয় বা খরচ অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়ে, তবে ব্যাংকের তরলতা অবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
কর রাজস্বের দিক থেকেও প্রভাব স্পষ্ট। ব্যাংকের মুনাফা কমে গেলে, সরকারকে প্রদানযোগ্য করের পরিমাণ হ্রাস পাবে। ফলে রাজস্বের প্রত্যাশা পূরণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা আর্থিক বছরের বাজেট পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজারে ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্তের প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু বিশ্লেষক উচ্চমূল্য সম্পদ ক্রয়কে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে কিছু লোক ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে অধিকাংশই একমত যে, এই ধরনের বড় প্রকল্পের জন্য স্বচ্ছতা ও যথাযথ তদারকি প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারী ও জনসাধারণের আস্থা বজায় থাকে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, সিটি ব্যাংককে তার মূলধন ব্যবহারের দক্ষতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং সম্ভাব্য আইনি ও নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি প্রকল্পটি সময়মতো সম্পন্ন হয় এবং প্রত্যাশিত আয় উৎপন্ন করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের সম্পদ পোর্টফোলিওতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমান উচ্চমূল্য ক্রয় ও ব্যয় কাঠামো নিয়ে অবিলম্বে তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে, বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।



