ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় মঙ্গলবার রাতের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, দুই প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক আলবার্ট গোম্বিস ও মরিস ট্যানের সঙ্গে আলোচনা শেষে জানালেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠন করা এখনও বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
বৈঠকে গোম্বিস ও ট্যান, যাঁরা ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের সময়ে বাংলাদেশে কাজ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাতে উভয় পক্ষই সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করে।
ইউনূসের মতে, পূর্বে শাসনকারী দলগুলো এখনও তাদের অতীতের অপরাধ স্বীকার করতে অনিচ্ছুক, ফলে এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সামাজিক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। তিনি জোর দিয়ে বললেন, অপরাধ স্বীকারোক্তি ও অনুতাপ ছাড়া সত্যের অনুসন্ধান এবং জাতীয় পুনর্মিলন সম্ভব নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, “যদি সরকারী নেতারা তাদের ভুল স্বীকার না করে, অনুতাপ না দেখায়, তবে সত্য ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া শুরু করা অর্থহীন।” এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অতীতের রাজনৈতিক দমন ও গুমের ঘটনা সম্পর্কে অব্যাহত অস্বীকারের সমালোচনা করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৫ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যা বর্ণবাদ‑পরবর্তী সমাজে বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউনূস এই উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এখনও সেই ধরনের প্রক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত নয়।
ইউনূস আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার—যা পূর্বে আওয়ামী লীগ শাসনকালে গৃহীত নীতি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত—অপরাধ স্বীকারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং, তারা জুলাই আন্দোলনের সময় নিহত যুবকদের হত্যার দায়িত্ব জঙ্গিদের ওপর আরোপ করে, যদিও অপরাধের প্রমাণ স্পষ্ট।
এই প্রমাণগুলো, যা বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে, জঙ্গিদের অপরাধের পাশাপাশি সরকারী দায়িত্বকে নির্দেশ করে। ইউনূসের মতে, এমন স্বীকৃতি ও অনুতাপের অভাবই সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের গঠনকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের মূল লক্ষ্য হল অতীতের অপরাধ উন্মোচন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সমাজকে পুনর্গঠন করা। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই মডেলটি গৃহযুদ্ধ, গুম ও হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোকে সেরে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
বাংলাদেশে এই ধরনের আলোচনার শিকড় ১৯৭১ের যুদ্ধের পর থেকে রয়েছে, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে বাস্তবায়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। কলামিস্ট ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহারও গত বছর মে মাসে উল্লেখ করেন, সত্য ও ন্যায়বিচার না হলে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।
ভবিষ্যতে যদি সরকার অপরাধ স্বীকারে পদক্ষেপ নেয় এবং সামাজিক সমঝোতার পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তবে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের গঠন পুনরায় আলোচনার বিষয় হতে পারে। তবে বর্তমান পর্যায়ে, ইউনূসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও অপরাধ স্বীকারোক্তির অভাবই এই উদ্যোগকে অগ্রসর হতে বাধা দিচ্ছে।



