ইরানের শাসনবিরোধী প্রতিবাদে তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি সামাজিক মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে জনগণের পাশে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দেশের বর্তমান অশান্তি কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বাস্তব পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
পাহলভি তার পোস্টে ইরানের নাগরিকদেরকে “আমার স্বদেশবাসী” বলে সম্বোধন করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিমধ্যে ইরানের প্রতিবাদকারীদের সাহসিকতা লক্ষ্য করেছে এবং তাদের কণ্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করছে। তিনি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধ করেন।
সেই সঙ্গে তিনি সরাসরি ইরানের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে একটি বার্তা প্রকাশ করেছেন। পাহলভি জোর দিয়ে বলেছেন, সৈন্যদেরকে ধর্মভিত্তিক শাসনের সেবক হিসেবে নয়, বরং দেশের সাধারণ মানুষের রক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। তিনি অতিরিক্ত সময় না থাকায় দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্বেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রেজা পাহলভি ১৯৬০ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইরানের শেষ শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বড় পুত্র। শৈশবেই তাকে যুবরাজের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছিল, তবে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের ফলে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং তার সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
বিপ্লবের পর থেকে তিনি এবং তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত অবস্থায় বসবাস করছেন। তার স্ত্রী ও তিন কন্যা সহ তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশে জীবনযাপন করছেন, তবে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার মন্তব্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নিয়মিত প্রকাশ পায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বৃহৎ পরিসরে সরকারি স্তরে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তাসনিম নামের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রথম জানাজা তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তী কয়েক দিনে অতিরিক্ত জানাজা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা সহিংস প্রতিবাদে শতাধিক নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। এই ক্ষতির জন্য সরকার বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপকে দায়ী করেছে এবং তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে।
বিপুল মানবিক ক্ষতি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ বাড়ার ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। পাহলভির সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান সরকারী নীতি ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে সম্ভাব্য টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবাদকারীরা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আহ্বান করেছে। একই সঙ্গে, সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জনগণের রক্ষক ভূমিকা গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে গোপনীয় আলোচনার সূত্র পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যদি সেনাবাহিনী পাহলভির আহ্বানকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, তবে তা শাসনবিরোধী আন্দোলনের গতিপথে পরিবর্তন আনতে পারে এবং সরকারকে আলোচনায় ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর অবিচল অবস্থান পরিস্থিতি আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে রেজা পাহলভির ভূমিকা আন্তর্জাতিক নজরে ফিরে এসেছে। তার বার্তা ইরানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের সমঝোতা হবে তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈশ্বিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন ও প্রতিবাদকারীদের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধনের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছেন। তদুপরি, সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগের পেছনে কূটনৈতিক কৌশলও কাজ করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলবে।



