ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর‑পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিগুলোর পুনরায় কার্যকরী করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে দিল্লি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। লক্ষ্য হল আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
সরকারি সূত্র টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানায়, পুনরুজ্জীবিত নেটওয়ার্কটি বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে অবস্থিত রাজ্যগুলোর জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তাই এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পুনর্গঠন কাজের প্রথম ধাপ হিসেবে রংপুরের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি, যা চিকেন নেকের কাছাকাছি অবস্থিত, পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই স্থানটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পূর্বে মিত্রবাহিনীর সরবরাহ রসদঘাঁটি হিসেবে কাজ করত।
অন্যান্য চিহ্নিত বিমানঘাঁটিগুলোর মধ্যে রয়েছে জলপাইগুড়ির আম্বারি ও পাঙ্গা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, মালদহের ঝালঝালিয়া এবং আসামের ধুবরি। সবগুলোই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর জন্য কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
ঐ সময় উত্তর‑পূর্বাঞ্চল জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অঞ্চলে মিত্রবাহিনীর অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রসদ ঘাঁটি হিসেবে কাজ করত। ত্রিপুরা, আসাম ও বাংলায় বিস্তৃত এই বিমানঘাঁটিগুলো বার্মা অভিযান, চীন‑বার্মা‑ভারত থিয়েটার এবং লেডো (স্টিলওয়েল) সড়কের মতো সরবরাহ রুটকে সমর্থন করত।
এই পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা কেবল সামরিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; সরকার এটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পর্যটন উন্নয়নের সুযোগ হিসেবেও দেখছে। পুনরায় কার্যকরী বিমানঘাঁটিগুলো থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবহন খরচ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সরকার এই পদক্ষেপকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। সীমান্তে বাড়তি সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা বজায় রাখা উচিত।
দিল্লি এই উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তর‑পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে চায়, যা পূর্বের সময়ে কেবল সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ছিল। নতুন রোড, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সিভিল এয়ারপোর্টের সম্ভাব্য রূপান্তর অঞ্চলটির সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই পদক্ষেপটি ভারতের নিরাপত্তা নীতি ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা। যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে এটি সীমান্তে স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে উত্সাহিত করতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করছেন যে অতিরিক্ত সামরিক অবকাঠামো নির্মাণে স্থানীয় জনগণের অধিকার ও পরিবেশগত প্রভাবকে উপেক্ষা করা হলে সামাজিক বিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রকল্পের বাস্তবায়নে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মতামত ও পরিবেশগত মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে, পুনরায় চালু করা বিমানঘাঁটিগুলোকে সিভিল এয়ারলাইনসের জন্যও উন্মুক্ত করা হতে পারে, যা আঞ্চলিক সংযোগকে আরও শক্তিশালী করবে। সরকার ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা তৈরি করছে, যাতে কৌশলগত ও সিভিল উভয় দিকই সমন্বিতভাবে কাজ করে।
সারসংক্ষেপে, দিল্লি নিরাপত্তা, কৌশল এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের মিশ্র লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা চালু করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিপথ, সীমান্তের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিক উন্মোচিত হবে।



