যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স বুধবার শ্বেত বাড়িতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং মার্কো রুবিওকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবেন। এই বৈঠকটি বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন, সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হবে।
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের নিকটবর্তী শ্বেত বাড়িতে আলোচনার সূচনা হবে, তবে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের শপিং মলে একটি ডিজিটাল টিকারের মাধ্যমে “ট্রাম্প”, “গ্রিনল্যান্ড” এবং “সার্বভৌমত্ব” শব্দগুলো লাল রঙে বারবার দেখা যাচ্ছে। এই দৃশ্যটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা সামরিক হস্তক্ষেপের পর, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ তার কথায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডকে “সহজে বা কঠিনে” নিজের করে নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।
বৈঠকের পূর্বে নুকের রাস্তায় চলমান গণনা গতি বাড়িয়ে দেয়। পথচারীরা জানান, দিনগুলো যেন বছর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক স্থানীয় নারী, যিনি ঐতিহ্যবাহী সিলের ত্বক দিয়ে তৈরি পুয়ালুক গ্লাভস খুলে হাত নাড়িয়ে কথা বলছেন, তিনি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শোনার জন্য বেশি কান ব্যবহার করতে এবং কম কথা বলতে উৎসাহিত করতে চাই। আমাদের দেশ বিক্রি হবে না, আমাদের ভূমি বিক্রি হবে না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ পেয়েছে।
ইনুইট লেখক ও সঙ্গীতশিল্পী সিভনিসসক রাস্কেরও একই রকম মত প্রকাশ হয়েছে। তিনি গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা কামনা করে বলেছেন, “দেশটি যেন বিক্রি না হয়, বরং স্বনির্ভর ও সুশাসিত থাকে।” অন্যদিকে, সাত সপ্তাহের শিশুর মা মারিয়া, শীতের কোটে মোড়ানো অবস্থায়, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, “আমার ছোট পরিবারের জন্য ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছি। আমরা এত মনোযোগ চাই না।” এসব ব্যক্তিগত উদ্বেগ বৈশ্বিক কূটনৈতিক আলোচনার সঙ্গে মিশে গেছে।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে না। ন্যাটো সদস্য দেশ ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রহের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, তবে তা ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং ট্রান্সআটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোটের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পদক্ষেপকে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা” বলে উল্লেখ করেছেন।
এই আলোচনার ফলাফল কেবল গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং উত্তর আটলান্টিকের সামগ্রিক নিরাপত্তা নীতির ওপরও প্রভাব ফেলবে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের দাবি শক্তিশালী হয়, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে, ডেনমার্কের দৃঢ় অবস্থান ন্যাটো জোটের ঐক্য বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বৈঠকের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের কূটনীতিকরা গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ শেয়ারিং, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় জনগণের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনা করছেন। এই কাঠামোটি আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যাটো চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বৈঠকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয়ই শেষ ফলাফলকে নির্ধারণ করবে। বৈঠকের ফলাফল কী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, ডেনমার্কের অবস্থান এবং গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের দৃঢ়তা কতটা বজায় রাখতে পারবে তার ওপর।



