তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে যে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তিতে তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে। এই প্রস্তাবটি নেটোর অনুচ্ছেদ ৫‑এর সমতুল্য শর্তাবলীর ওপর ভিত্তি করে, যেখানে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণকে সমগ্র জোটের প্রতি আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রথমে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এই চুক্তি, তবে এখন আঙ্কারাকে অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। তুরস্কের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েল সম্পর্কিত নীতি অঞ্চলীয় শক্তিগুলোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছে, ফলে দেশগুলো নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, তুরস্কের দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু অংশে কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের স্বার্থের সমন্বয় বাড়ছে। এই সমন্বয়ই ত্রিপক্ষীয় জোটের গঠনকে যৌক্তিক করে তুলছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এই সপ্তাহের প্রথম দিকে আঙ্কারায় একটি নৌবাহিনীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা সহযোগিতার নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন।
সৌদি‑পাকিস্তান জোটের সম্ভাব্য সম্প্রসারণের গুরুত্ব তুরস্কের নেটো সদস্যপদে নিহিত। তুরস্ক নেটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই তুরস্কের অংশগ্রহণ জোটের সামগ্রিক সামরিক ক্ষমতা ও কৌশলগত পরিসরকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয়ই ইরানের শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ভাগ করে নিচ্ছে, তবে তারা তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। উভয় দেশই সুন্নি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সমর্থন জানায় এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ইতিমধ্যে দৃঢ় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। তুরস্ক পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে, পাশাপাশি কয়েক ডজন এফ‑১৬ যুদ্ধবিমানের আধুনিকায়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছে। তুর্কি ও পাকিস্তানি বাহিনী ড্রোন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করে, যা উভয় দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এছাড়া, তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান (F‑35) কর্মসূচিতে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই উদ্যোগটি ত্রিপক্ষীয় জোটের সামরিক সমন্বয়কে আরও গভীর করতে পারে এবং উচ্চতর প্রযুক্তি ভাগাভাগির মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে।
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় শুরু করেছে বলে সূত্রগুলো জানায়। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, নিকট ভবিষ্যতে যৌথ সামরিক মহড়া এবং সরঞ্জাম ক্রয়ের পরিকল্পনা করা হবে। এই ধরনের কার্যক্রম জোটের কার্যকরী কাঠামো গড়ে তুলতে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করবে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ফলাফল আগামী ছয় মাসের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হতে পারে। যদি চুক্তি সম্পন্ন হয়, তবে প্রথম ধাপ হিসেবে যৌথ নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও ড্রোন অপারেশন নিয়ে কাজ শুরু হবে, এরপর বিমানবাহিনীর সমন্বয় এবং উচ্চতর স্তরের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুসরণ করবে।
এই সম্ভাব্য জোটের গঠন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নতুন প্রভাব ফেলতে পারে। নেটোর ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর বাইরে একটি আঞ্চলিক জোটের উদ্ভব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়কে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। তুরস্কের নেটো সদস্যপদ এবং একইসাথে নতুন জোটের অংশগ্রহণ তার দ্বি-সামরিক নীতি—পশ্চিমা জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং আঞ্চলিক স্বার্থের স্বায়ত্তশাসন—কে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করবে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা উদ্যোগের পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, উভয় পক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় সভা এবং যৌথ সামরিক মহড়া পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সভাগুলোতে চুক্তির আইনি কাঠামো, সামরিক সম্পদ ভাগাভাগি এবং কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, তুরস্কের সক্রিয় ভূমিকা সৌদি‑পাকিস্তান নিরাপত্তা চুক্তিকে নেটো‑সদৃশ আঞ্চলিক জোটে রূপান্তরিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই জোটের গঠন আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং নেটোর ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশে নতুন মাত্রা যোগ করবে।



