বেইজিং‑এ অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্সে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ওয়াং জুন জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালে চীনের মোট বাণিজ্য পরিমাণ ৪৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান অতিক্রম করেছে, যা প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক শীর্ষে পৌঁছেছে। এই রেকর্ডটি গ্লোবাল চাহিদা স্থিতিশীল থাকায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বৃদ্ধির পরেও চীনা পণ্যের রপ্তানি শক্তিশালী থাকার ফলে সম্ভব হয়েছে।
কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, মোট বাণিজ্য পরিমাণ প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা প্রায় ৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। একই সময়ে রপ্তানি ২০২৪ সালের তুলনায় ৬.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে আমদানি মাত্র ০.৫ শতাংশ বাড়ে। রপ্তানি এখনও চীনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, তবে আমদানি বৃদ্ধিও সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যকে সমর্থন করেছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য রপ্তানি বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কারণ এটি উৎপাদন ক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সরাসরি প্রতিফলন। ২০২৫ সালের রপ্তানি বৃদ্ধির হার নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি সত্ত্বেও চীনা পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা অব্যাহত রয়েছে।
ওয়াং জুন উল্লেখ করেছেন যে, কিছু দেশ বাণিজ্য বিষয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চীনের উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি সীমাবদ্ধ করেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যদি এই ধরনের সীমাবদ্ধতা না থাকত, তবে চীনের আমদানি পরিমাণ আরও বেশি হতে পারত। এই মন্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আরোপিত ট্যারিফের প্রতি সূক্ষ্ম সমালোচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাণিজ্য নীতির এই রাজনৈতিক দিকটি চীনের সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত অর্ধচালক, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রে। তবে বর্তমান ডেটা দেখায় যে, সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহে বড় ধরনের বাধা সত্ত্বেও চীন তার বাজারকে সক্রিয়ভাবে রক্ষা করছে।
২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে, চীনা সরকার বাজারকে আরও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই উন্মুক্ততা কেবল চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণই নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অংশীদারদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষত, উৎপাদন, লজিস্টিক্স এবং ডিজিটাল সেবা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে।
বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো এই রেকর্ডকে চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করছে। উচ্চ বাণিজ্য ভলিউমের ফলে চীনের মুদ্রা রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে চীনের উৎপাদন শিল্পের আউটপুটও বাড়বে, যা গ্লোবাল সরবরাহ শৃঙ্খলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে, বাণিজ্যিক পরিবেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রক্ষা নীতি (প্রোটেকশনিজম) এখনও ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধের সম্ভাবনা, বিশেষত উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা, ভবিষ্যতে বাণিজ্য পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই, চীনের বাণিজ্য নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য ভলিউমে নতুন শীর্ষে পৌঁছানো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। রপ্তানি ও আমদানি উভয়েরই বৃদ্ধি, পাশাপাশি বাজারের উন্মুক্ততা পরিকল্পনা, চীনের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক মঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে। তবে, বাণিজ্যিক রাজনৈতিক চাপ এবং রক্ষা নীতির সম্ভাব্য প্রভাবকে বিবেচনা করে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।



