দোহা – কাতার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজিদ আল‑আনসারি মঙ্গলবার একটি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে গালফ অঞ্চলে এবং তার বাইরে গুরুতর পরিণতি দেখা দিতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো ধরনের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে সকল পক্ষই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
আল‑আনসারি বলেন, বর্তমান সময়ে যে কোনো উত্তেজনা কেবলমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহকেও প্রভাবিত করবে। তাই কাতার এই ঝুঁকি কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং সংঘাতের বিকাশ রোধে সক্রিয় ভূমিকা নিতে ইচ্ছুক।
গত বছর জুনে ইরান কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল‑উদেইদ সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণটি ইরানের জন্য প্রথমবারের মতো বিদেশে সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ছিল এবং গালফের নিরাপত্তা পরিবেশে অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
আল‑উদেইদ ঘাঁটির ওপর ইরানের হামলার আগে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সুবিধায় একটি বিস্তৃত আকাশীয় আক্রমণ চালিয়েছিল। উভয় পক্ষের এই পারস্পরিক আক্রমণ গালফ অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্যকে অস্থির করে তুলেছিল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই তীব্রতা দেখা দিলে, কাতার দ্রুত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পদক্ষেপ নেয়। দু’দেশের মধ্যে তাত্ক্ষণিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে কাতার কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে আলোচনা চালায় এবং উভয় পক্ষকে সংলাপের পথে ফিরিয়ে আনে। এই মধ্যস্থতা গালফের নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইরানে গত বৃহস্পতিবার থেকে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা সরকারবিরোধী নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে এবং দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্লেষকরা এটিকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ বাড়ছে। হোয়াইট হাউসের সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তি দমন করতে বিমান হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, ইরানে প্রতিবাদে নিহতের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান এবং সঠিক পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশিত হয়নি। ইন্টারনেটের ব্যাপক বন্ধের পরও কিছু তথ্য সামাজিক মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, যা পরিস্থিতির তীব্রতা নির্দেশ করে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও নৌবাহিনীর অবকাঠামোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে চিহ্নিত করে, সম্ভাব্য প্রতিশোধের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কাতার সরকার এই পরিস্থিতিতে গালফের সামগ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, কোনো পক্ষই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না এবং কূটনৈতিক সমাধানই একমাত্র টেকসই পথ।
বিশ্বের তেল বাজারে গালফের অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এই অঞ্চল বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রধান রুট। যদি সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে, তবে তেল মূল্যে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রধান শক্তিগুলোকে আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে তারা গালফের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের উত্তেজনা হ্রাসের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে। কাতার এই দৃষ্টিকোণ থেকে আশাবাদী যে, সংলাপ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে অঞ্চলের শান্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।



