১৩ জানুয়ারি, টুইটারের উত্তরাধিকারী প্ল্যাটফর্ম এক্স‑এ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলি লারিজানি ইরানের চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই দুই বিশ্ব নেতার নামই ইরানি জনগণের রক্তপাতের ইতিহাসে অম্লানভাবে খোদিত হবে।
ইরানে ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (HRANA) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ১,৮৪৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। সংস্থা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখার অভিযোগে ইরানি কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। লারিজানির মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের উসকানিতেই ইরানে বর্তমান চরম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিযোগের পটভূমিতে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী মন্তব্য রয়েছে, যেখানে তিনি বিক্ষোভকারীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা শীঘ্রই আসবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’‑এ প্রকাশিত এক পোস্টে তিনি ইরানি দেশপ্রেমিকদের বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে এবং সরকারী সংস্থাগুলো দখল করতে উৎসাহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন, কারণ তাদের বড় মূল্য দিতে হবে।” এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে।
HRANA‑এর প্রতিবেদনে বিক্ষোভের প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থা ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে তথ্য সংগ্রহে বাধা পেয়েছে, ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করা কঠিন। তবুও, সংস্থার প্রকাশিত সংখ্যা ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তির মাত্রা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
লারিজানি এক্স‑এ পোস্ট করে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে “ইরানি জনগণের প্রধান হত্যাকারী” হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। তিনি বলেন, যদি ইরানি জনগণের প্রধান হত্যাকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়, তবে প্রথম স্থানে ট্রাম্পের নাম থাকবে, আর দ্বিতীয় স্থানে নেতানিয়াহুর নাম। এই র্যাঙ্কিং ইরানের সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হস্তক্ষেপকে কঠোরভাবে নিন্দা করে।
উল্লেখযোগ্য যে, লারিজানি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি যুক্তি দেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলে ইরানের নাগরিক আন্দোলন ধীরে ধীরে রক্তপাতের পথে অগ্রসর হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করছে।
এর আগে, ২ জানুয়ারি ট্রাম্প ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উদ্ধার’ করতে আসবে বলে মন্তব্য করেন। লারিজানি সেই সময়ই সতর্ক করেন, আমেরিকার হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকেই ক্ষতি হবে। এই পূর্বাভাসের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান উসকানিমূলক বক্তব্যকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আরও অনুপযুক্ত বলে গণ্য করা হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কাউন্সিলের এই ধরনের প্রকাশনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই লারিজানির মন্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, আর ইরানীয় সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই দেশের নীতি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের পুনর্মূল্যায়ন প্রত্যাশিত। ভবিষ্যতে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মেলবন্ধন কীভাবে গড়ে উঠবে, তা অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



