কমিশন অব ইনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (CIED) গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২১১ জন ইউনিফর্মধারী কর্মীর ওপর প্রশ্নোত্তর চালানো হয়েছে। এদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ১০০জন, পুলিশ ৯৮জন, বিমানবাহিনীর পাঁচজন, বাংলাদেশ গার্ড ৫জন, নৌবাহিনীর তিনজন এবং কোস্ট গার্ডের একজন অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবেদনটি চিফ অ্যাডভাইজার প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনে অন্তত ১৩টি গোপন আটক কেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জোরপূর্বক অদৃশ্যতা ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই কেন্দ্রগুলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (CTTC), ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ এবং বগুড়া, কক্সবাজার, দিনাজপুর ও বাগেরহাটের পুলিশ ইউনিটের তত্ত্বাবধানে ছিল।
পুলিশের পরিচালিত সেলগুলো সংশ্লিষ্ট থানা লাইনে অবস্থিত, আর CTTC তার আটককারীদের অফিসের প্রথম ও সপ্তম তলায় রাখা ছিল বলে কমিশন জানিয়েছে। এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, পুলিশ সংস্থাগুলো তুলনামূলকভাবে কম গোপনীয়তা বজায় রেখেছিল, ফলে আটককারীরা তাদের অবস্থান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিচয় জানাতে পারত।
রাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) সংক্রান্ত সেলগুলোতে ভিন্ন পদ্ধতি দেখা যায়। রাব ইন্টেলিজেন্সের টাস্কফোর্স ফর ইন্টাররোগেশন সেল (TFI) এবং রাব সদর দফতরের পিছনে গ্লাস ফেসেড ভবনে অবস্থিত ‘ক্লিনিক’ নামে পরিচিত একটি গোপন কেন্দ্র উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও রাব-১, রাব-৭ এবং রাব-১১ তে অতিরিক্ত সেল পরিচালিত হয়। এই সেলগুলোতে তথ্য ও অবস্থান গোপন রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) একই ভবনের মধ্যে একটি যৌথ ইন্টাররোগেশন সেল চালু করেছিল। ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) গুলশানের অফিসে একটি গোপন আটক কেন্দ্র পরিচালনা করত। উভয় সংস্থা তাদের কার্যক্রমের গোপনীয়তা বজায় রাখতে উচ্চ স্তরের সিকিউরিটি প্রোটোকল ব্যবহার করত।
কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিবি (ডিপার্টমেন্ট অফ ব্যুরো) ও CTTC তে গোপনীয়তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল, ফলে আটককারীরা তাদের অবস্থান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করতে পারত। অন্যদিকে রাব ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিএফআই কঠোরভাবে পরিচয় ও অবস্থান গোপন রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, এবং সামরিক কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধানের অভাবেও একটি প্রতিষ্ঠিত গোপনীয়তা সংস্কৃতি বজায় রেখেছিল।
প্রতিবেদনের পূর্ণ অংশে ‘গলফ অপারেশনস’ নামে কোডনেমযুক্ত অপারেশনগুলোর সঙ্গে যুক্ত প্রধান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই অপারেশনগুলোতে গোপন আটক, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক অদৃশ্যতা অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশন প্রাথমিকভাবে ৪০ জন রাব কর্মকর্তা, ১১ জন ডিজিএফআই কর্মকর্তা, ১১ জন পুলিশ কর্মকর্তা, ৯ জন CTTC কর্মকর্তা, ৬ জন ডিবি কর্মকর্তা, ৩ জন লফুল ইন্টারসেপশন সেন্টার (LIC) কর্মকর্তা এবং ২ জন অতিরিক্ত কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে। এই তালিকায় নাম উল্লেখিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি চিফ অ্যাডভাইজারকে উপস্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তদন্তের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং গোপন আটক কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি করা হতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অপারেশন রোধে তদারকি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য নীতি প্রণয়ন প্রত্যাশিত।



