২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে মুক্তিযোদ্ধা বীরদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে “বীরের কণ্ঠে বীরগাথা” নামের একটি বৃহৎ প্রকল্প চালু করা হয়। মোট বাজেট ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা নির্ধারিত হয় এবং কাজের সমাপ্তি নির্ধারিত ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তথ্যচিত্র তৈরি, সমান সংখ্যক ইউটিউব কনটেন্ট উৎপাদন এবং মোট ১৬টি ডকুমেন্টারি রেকর্ড করা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি সাক্ষাৎকারকে ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হবে।
প্রকল্পের বাস্তবায়নের দায়িত্ব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমটিআই) নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এই সংস্থার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৬ মে ২০২৩ তারিখে, যা প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে।
চুক্তি অনুযায়ী, এমটিআইকে প্রথমে ১২,৭৮৮টি সাক্ষাৎকারের তথ্যচিত্র তৈরি করতে বলা হয়। এই পর্যায়ে উৎপাদিত কাজকে মানসম্পন্ন বলে বিবেচনা করা হয়। তবে পরবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত ১৪,৬৪০টি সাক্ষাৎকারের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
এমটিআইয়ের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আজমল কবির রাব্বি উল্লেখ করেন, পূর্বের ১২,৭৮৮টি সাক্ষাৎকার যদি মানের দিক থেকে সন্তোষজনক হয়, তবে পরের ১৪,৬৪০টি কেন নিম্নমানের হতে পারে, এ বিষয়ে স্পষ্টতা দরকার। তিনি এই বিষয়টি প্রকল্পের তদারকি সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করার ইঙ্গিত দেন।
প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের আগে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল, তবে একই বছরের জুলাই মাসে সরকার পরিবর্তনের ফলে আওয়ামী লীগ শাসন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে এবং চূড়ান্ত সমাপ্তি তারিখে প্রভাব ফেলেছে।
বিপরীত রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনের অগ্রাধিকার ভিন্ন হওয়ায় এমন দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক প্রকল্পের তহবিল ও সমর্থন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, চুক্তি অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা পুনরায় বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রকল্পের আর্থিক দিক থেকে দেখা যায়, ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বাজেটের বড় অংশ ইতিমধ্যে এমটিআইকে প্রদান করা হয়েছে। এই তহবিলের ব্যবহার, বিশেষ করে ইউটিউব কনটেন্টের উৎপাদন ও ডকুমেন্টারির নির্মাণে কতটা ব্যয় হয়েছে, তা এখনও প্রকাশ্যে না আসায় প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তুতে দেখা যায়, বেশিরভাগ বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম নিয়ে কথা বলেছেন। এই তথ্যগুলোকে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান সম্পদ হবে।
প্রকল্পের সমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত, ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া তথ্যচিত্র ও ইউটিউব কনটেন্টের প্রকাশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বা সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি। তাই সাধারণ জনগণ এই ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলোতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে না।
সামগ্রিকভাবে, “বীরের কণ্ঠে বীরগাথা” প্রকল্পের লক্ষ্য ও বাজেট স্পষ্ট, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন, চুক্তি বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং তহবিলের ব্যবহার নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে সরকার যদি এই উদ্যোগকে পুনরায় চালু করে, তবে স্বচ্ছতা ও সময়মতো সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।



