উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিশিয়া ও লিবিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আজ থেকে কয়েক দিন ধরে আমাজিগ সম্প্রদায়ের সদস্যরা ইয়েন্নায়ার নামে পরিচিত নতুন বছর উদযাপন করছেন। এই উৎসবটি ১২ থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে এবং স্থানীয় ক্যালেন্ডার অনুসারে ২৯৭৬ বছর চিহ্নিত করে।
ইয়েন্নায়ার ক্যালেন্ডারটি ৯৫০ খ্রিস্টপূর্বে শেশঙ্ক নামের মিশরের রাজা সিংহাসনে আরোহণের মুহূর্ত থেকে গণনা করা হয়, ফলে আজকের তারিখে আমাজিগরা প্রায় এক হাজার বছর অগ্রগামী হিসেবে গণ্য হয়। যদিও সময় ভ্রমণ সম্ভব হয়নি, তবে এই ঐতিহাসিক সূচনা তাদের সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
উৎসবের সময় পরিবারগুলো বিশাল ভোজের আয়োজন করে, বড় বড় অগ্নিকুণ্ডে আগুন জ্বালায় এবং ঐতিহ্যবাহী সুরে সঙ্গীত বাজায়। গাঁইয়া ও শহরের রাস্তায় “আসেগগাস আমেগগাজ” (শুভ নতুন বছর) চিৎকার শোনা যায়, যা আনন্দের প্রতীক।
উৎসবের মূল আকর্ষণ হল ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পরিধান। সূক্ষ্ম সূচিকর্মে সজ্জিত রঙিন পোশাক পরিধান করে মানুষগুলো গর্বের সঙ্গে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে। এই পোশাকগুলো প্রাচীন আমাজিগ নকশার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং সামাজিক মর্যাদা প্রকাশের মাধ্যম।
“আমাজিগ” শব্দের অর্থ “স্বাধীন মানুষ” বা “উচ্চমানের মানুষ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তারা উত্তর আফ্রিকার আদিবাসী গোষ্ঠী, যাদের উপস্থিতি লিখিত ইতিহাসের শুরুর দিক থেকে রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও সরকারী পরিসংখ্যানের অভাবে সঠিক জনসংখ্যা নির্ধারণ কঠিন, তবে অনুমান অনুযায়ী এই গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা দশ মিলিয়নেরও বেশি।
আলজেরিয়া ও মরক্কোতে আমাজিগের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যেখানে মরক্কোর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষকে আমাজিগ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গোষ্ঠীর বিস্তৃতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অঞ্চলভেদে ভিন্নতা প্রদর্শন করে।
ইয়েন্নায়ার মূলত পারিবারিক মিলনমেলা, যেখানে নবীনতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ঐতিহাসিক সংযোগকে উদযাপন করা হয়। উৎসবের সময় পরিবারগুলো একত্রিত হয়ে খাবার ভাগ করে, পুরনো রীতি পুনরুজ্জীবিত করে এবং ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি কামনা করে।
প্রতিটি অঞ্চলের খাবার ভিন্ন রকমের। মরক্কোর হাই আটলাস অঞ্চলে “ওরকেমেন” নামে একটি পুষ্টিকর মিশ্রণ জনপ্রিয়, যা ডাল, মশলা ও সম্পূর্ণ শস্যের সমন্বয়ে তৈরি। আলজেরিয়ায় “ত্রেজ” নামে মিষ্টি, শুকনো ফল ও বাদাম মিশ্রণ প্রধান খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়।
কিছু পরিবারে ত্রেজের মিশ্রণটি ছোট শিশুর উপর হালকাভাবে ছিটিয়ে দেয়া হয়, যা সমৃদ্ধি ও শুভকামনা নির্দেশ করে। এই রীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা একটি প্রতীকী কাজ, যা নতুন বছরের শুভেচ্ছা বহন করে।
ইয়েন্নায়ার শুধুমাত্র পারিবারিক স্তরে সীমাবদ্ধ নয়; সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অংশও এতে অংশ নেয়। শহর ও গ্রামে প্যারেড, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও উত্সবমুখর কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়, যা সামাজিক সংহতি বাড়ায় এবং ঐতিহ্যকে আধুনিক পরিবেশে সংযুক্ত করে।
উৎসবের সময় গৃহস্থালির বাইরে সংগঠিত এই ইভেন্টগুলোতে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, বাদ্যযন্ত্রের সুর এবং স্থানীয় শিল্পীর পারফরম্যান্স দেখা যায়। অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে, যা তাদের সাংস্কৃতিক গর্বকে আরও উজ্জ্বল করে।
ইয়েন্নায়ার উদযাপন উত্তর আফ্রিকায় আমাজিগদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এটি তাদের ঐতিহাসিক শিকড়, ভাষা ও রীতির সংরক্ষণে সহায়তা করে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের মূল্যবোধ শেখায়।
এই বছরের উদযাপন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি মনোযোগ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যটক ও গবেষকরা এই সময়ে অঞ্চল পরিদর্শন করে, স্থানীয় রীতি-নীতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
সারসংক্ষেপে, ইয়েন্নায়ার একটি ঐতিহ্যবাহী নতুন বছর, যা পরিবার, সম্প্রদায় ও প্রাকৃতিক সংযোগকে একত্রিত করে। আমাজিগরা তাদের প্রাচীন ক্যালেন্ডার, রঙিন পোশাক ও স্বাদযুক্ত খাবারের মাধ্যমে এই দিনটি উদযাপন করে, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শক্তিশালী প্রকাশ।



