ইরানের বর্তমান সরকারকে পশ্চিমা দেশগুলো ২০২৬ সালে তীব্র সমালোচনা করে, আর্থিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাপক প্রতিবাদকে সরকারের অক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের শাসনকে ‘হত্যাকারী শাসন’ বলে অভিহিত করে, এবং ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও পারমাণবিক পরিকল্পনা সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
১৯৭৯ সালে শেষ শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের পূর্বে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তার শাসনের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষত সাভাক গোপন গার্ডের রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের জন্য তীব্র সমালোচনা করেন। তদুপরি, শাহের ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দমন, তেল থেকে প্রাপ্ত সম্পদের অসম বণ্টন এবং তার পরিবারিক বিলাসবহুল জীবনধারা পশ্চিমা মিডিয়ার তীব্র নজরে আসে।
শাহের ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামে পরিচিত আধুনিকীকরণ নীতি রক্ষণশীল সমাজের বিরোধের মুখে পড়ে, যা পশ্চিমা লিবারেল বৃত্তেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ঐতিহাসিক পটভূমি আজকের ইরানকে আন্তর্জাতিক নজরে রাখার একটি ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতির তীব্র বৃদ্ধি দেখা যায়। সরকারকে এই আর্থিক অস্থিরতার জন্য দায়ী করা হয়, যদিও বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এই পরিস্থিতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা শাসনের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৫ সালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর, পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের গোপন পারমাণবিক পুনরায় গঠন প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এই উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায়, ইরান সরকার ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রতিবাদ দমন করতে কঠোর বলপ্রয়োগ এবং ফাঁসির ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পদক্ষেপকে ‘হত্যাকারী শাসন’ হিসেবে সমালোচনা করে, এবং ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আন্তর্জাতিক নিন্দার বিষয় করে তুলেছে।
ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করলে দেশকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে বলে হুমকি দেন। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করা সহজ বলে উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাকে ‘সহজ লক্ষ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে, ট্রাম্প ইরানকে প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালানো বন্ধ করতে সতর্ক করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি প্রকাশ করেন।
এই ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটও পরিবর্তনের মুখে। ১৯৬৭ সালে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি নিজেকে সম্রাট ঘোষণার পর থেকে, ইরানের শাসনব্যবস্থা বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরের দমন এখনও প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর বর্তমান অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা আর্থিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রতিবাদ দমনের ক্ষেত্রে ইরানকে দায়ী করে, এবং পারমাণবিক অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা বজায় রাখে। ভবিষ্যতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইরানের শাসনব্যবস্থার ওপর পশ্চিমা সমালোচনা এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা, পাশাপাশি দেশের আর্থিক ও সামাজিক অস্থিরতা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই দৃষ্টিভঙ্গি ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি গঠনে এবং আঞ্চলিক শক্তি সমতা নির্ধারণে প্রভাবশালী হবে।



