গত শুক্রবার ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি গুলিবর্ষণ ঘটেছে, যার ফলে অনিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর রক্তপাত হয়েছে। দক্ষিণের একটি ছোট শহরে ৪০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা (ছদ্মনাম ওমিদ) জানান, নিরাপত্তা বাহিনী ক্যালাশনিকভ‑ধরনের রাইফেল ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের লাইনে সরাসরি গুলি চালিয়েছে। তিনি দেখেছেন, মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই গুলি আঘাত পেয়ে মাটিতে পতিত হয়েছে। ওমিদের মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর এই আক্রমণ একতরফা যুদ্ধের মতো, যেখানে শাসক গোষ্ঠী ভারী অস্ত্রধারী, আর প্রতিবাদকারীরা কেবল স্লোগান দিয়ে প্রতিরোধ করছিল।
ইরানের রাজধানী তেহরানে একই দিনে পরিস্থিতি আরও তীব্রতর হয়েছে। এক তরুণী বর্ণনা করেন, বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে শহরের বিভিন্ন কোণে মানুষ জমায়েত হয়েছিল, তবে শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তিনি ঘটনাকে “রক্তঝরা দিন” বলে উল্লেখ করেন এবং তেহরানকে যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়েছে বলে জানান। তার মতে, এই সংঘর্ষে একপাশে ভারী অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী, অন্যপাশে কেবল স্লোগান শোনানো নিরস্ত্র মানুষ রয়েছে, ফলে যুদ্ধের ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে।
তেহরানের পশ্চিমে অবস্থিত ফারদিস শহরে বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি পারামিলিটারি গোষ্ঠী হঠাৎ করে আক্রমণ চালায়। এই গোষ্ঠী, যা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অধীন, বাসিজ ফোর্সের সদস্যদের নিয়ে গঠিত, ইউনিফর্ম পরা এবং মোটরসাইকেলে চড়ে বিক্ষোভকারীদের দিকে তাজা গুলি ছোড়ে। কয়েকটি অচিহ্নিত গাড়ি গলিতে প্রবেশ করে, গাড়ির ভিতর থেকে বাসিন্দাদের দিকে গুলি চালায়। এই আক্রমণেও অনিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হয়, যা বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাদের প্রাণহানির দিকে নিয়ে যায়।
বিক্ষোভের মূল দাবি সরকারবিরোধী পরিবর্তন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, শাসক গোষ্ঠী তাদের মতামত দমন করতে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করছে। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী তরুণ ও নারী উভয়ই উল্লেখ করেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ তাদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছে এবং শহরের সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যাহত করেছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই ধরনের একতরফা সহিংসতা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর প্রতিবাদ ও সম্ভাব্য দমনমূলক পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সরকার যদি নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার সীমিত না করে, তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিক্ষোভে নিহত ও আহতদের সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ অনির্দিষ্টভাবে অনিরস্ত্র নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নজরে আসতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



