গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৯৪৮ জনের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ণয় করা হয়েছে। এদের মধ্যে জামায়াত‑শিবিরের নেতাকর্মীর সংখ্যা সর্বোচ্চ, আর বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের নিখোঁজের হার সর্বোচ্চ শতাংশে রেকর্ড হয়েছে।
কমিশনকে মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ পাওয়া যায়, যার মধ্যে দ্বিগুণ ও গুম নয় এমন কেস বাদ দিয়ে ১,৫৬৯টি একক অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অভিযোগগুলো থেকে ৯৪৮ জনের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
চিহ্নিত ৯৪৮ জনের মধ্যে জামায়াত‑শিবিরের নেতাকর্মীর সংখ্যা ৭১২, যা মোটের প্রায় ৭৫ শতাংশ। আর ২০৫ জনকে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ১১ জনের আওয়ামী লীগ এবং চারজনের হেফাজত‑ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
গুমের শিকার ২৫১ জনের মধ্যে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে ১৫৭ জনের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও বাকি ৯৪ জনের পরিচয় অজানা রইল। কমিশনের প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, গুমের পরবর্তী তদন্তে ৩৬ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং DNA পরীক্ষাসহ সকল সম্ভাব্য পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী নিখোঁজের ৬৮ শতাংশ বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী, আর জামায়াত‑শিবিরের নেতাদের হার ২২ শতাংশ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর হার ৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, রাজনৈতিক সংযোগের ভিত্তিতে গুমের ঘটনা ভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে গুমের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
কমিশনের প্রধান বিচারপতি এই তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা উচিত বলে জোর দিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গুমের শিকারদের শনাক্তকরণে DNA পরীক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
এই প্রতিবেদনের প্রকাশের পর রাজনৈতিক দলগুলো থেকে ভিন্নমত প্রকাশ পেয়েছে। জামায়াত‑শিবিরের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, তাদের সদস্যদের গুমের সংখ্যা অতিরঞ্জিত এবং তদন্তে রাজনৈতিক পক্ষপাত রয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো দাবি করেছে, সরকারকে গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি চৌধুরীর মতে, গুমের শিকারদের পরিবারগুলোকে যথাযথ সমর্থন ও আইনি সহায়তা প্রদান করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, গুমের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলবে এবং ভবিষ্যতে আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে।
গুম তদন্তের ফলাফল সরকারকে রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চাপ দেবে। বিশেষ করে, গুমের সঙ্গে যুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভূমিকা স্পষ্ট করা হলে, জনমত ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে চাপ বাড়বে।
পরবর্তী ধাপে, কমিশন সুপারিশকৃত DNA পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ এবং গুমের শিকারদের দেহ পুনরুদ্ধার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, গুমের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের আইনি দায়িত্ব আরোপের জন্য বিশেষ আদালত গঠন করা হতে পারে।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন আলোচনার সূচনা হতে পারে। গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না হলে, রাজনৈতিক সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়তে পারে এবং জনসাধারণের সরকারের প্রতি আস্থা হ্রাস পেতে পারে।
গুম তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং এর বাস্তবায়ন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মূল চাবিকাঠি হবে।



