প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উত্তর অংশে প্রায় আট হাজার বছর আগে তৈরি করা মাটির পাত্রের পুষ্পের নকশা, সংখ্যার ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে—এটি মানব ইতিহাসে গাণিতিক চিন্তার প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষকরা পাত্রের পাপড়ির সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, সেগুলো ৪, ৮, ১৬, ৩২ অথবা ৬৪ পাপড়ি নিয়ে গঠিত, যা দ্বিগুণের ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ফলাফলটি হ্যালাফীয় সংস্কৃতির শিল্পকর্মে গাণিতিক জ্ঞানের উপস্থিতি নির্দেশ করে।
হ্যালাফীয় সংস্কৃতি, যা প্রায় ৬২০০ থেকে ৫৫০০ খ্রিস্টপূর্বে উত্তর মেসোপটেমিয়ায় বসবাস করত, তার মাটির পাত্রে উদ্ভিদ-অনুপ্রাণিত নকশা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। যদিও প্রাগৈতিহাসিক গুহা চিত্রে উদ্ভিদ চিত্রের অভাব রয়েছে, হ্যালাফীয় সময়ে গাছ, শাখা, ফুল ইত্যাদির চিত্রণ পাত্রের সাজসজ্জায় নিয়মিত হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনটি মানব সমাজের কৃষিকাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায়, হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রত্নতাত্ত্বিক হাজারেরও বেশি পাত্রের টুকরা বিশ্লেষণ করে ৩৭৫টি টুকরায় ফুলের নকশা সনাক্ত করেছেন। প্রতিটি টুকরায় দেখা গিয়েছে যে, পাপড়ির সংখ্যা নির্দিষ্ট গাণিতিক ক্রম অনুসরণ করে, যা দ্বিগুণের ধারার সঙ্গে মিলে যায়। এই ধারাবাহিকতা কেবল নান্দনিক উদ্দেশ্যেই নয়, সম্ভবত মাটির মালিকানার ভাগ বা ফসলের বণ্টনের হিসাবের জন্যও ব্যবহার করা হতো।
ফুলের পাপড়ির সংখ্যা ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪—এগুলো গাণিতিকভাবে ২-এর ঘাতের সমান। গবেষকরা উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের গঠনমূলক নকশা তৈরি করতে সংখ্যার মৌলিক ধারণা এবং ধারাবাহিকতা সম্পর্কে সচেতনতা প্রয়োজন। তাই, হ্যালাফীয় মানুষরা সম্ভবত মৌলিক গাণিতিক নীতি ব্যবহার করে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে পরিকল্পনা ও সংগঠন করত।
এই আবিষ্কারটি গাণিতিক জ্ঞানের প্রাচীনতম প্রমাণের মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পূর্বে জানা যায় যে, প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার কিছু সভ্যতা গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করত, তবে হ্যালাফীয় পাত্রে দেখা গুণগত ধারাবাহিকতা তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রাচীনতম উদাহরণ হতে পারে। গবেষণাটি ৫ ডিসেম্বর জার্নাল অফ ওয়ার্ল্ড প্রিহিস্ট্রি-তে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, মানবজাতি প্রায় আট হাজার বছর আগে থেকেই সংখ্যা, গুণ এবং ধারার মৌলিক ধারণা ব্যবহার করছিল। এই জ্ঞান সম্ভবত ভূমি ভাগ, ফসলের পরিমাণ নির্ধারণ এবং সামাজিক সংগঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ফলে, প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এই দিকটি আধুনিক বিজ্ঞানকে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে।
এই ধরনের প্রাচীন নিদর্শন আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, গাণিতিক চিন্তা কেবল আধুনিক সময়ের ফল নয়, বরং মানব ইতিহাসের গভীর শিকড়ে নিহিত। যদিও এই তথ্যগুলো কোনো তাত্ক্ষণিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে না, তবে এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যায়ন বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
প্রাচীন শিল্পকর্মে লুকিয়ে থাকা গাণিতিক প্যাটার্নগুলোকে আরও বিশদে জানার জন্য আন্তঃবিষয়ক গবেষণা প্রয়োজন। পাঠকরা কি ভাবছেন, আর কোন প্রাচীন নিদর্শনগুলোতে এমন গাণিতিক সূচক লুকিয়ে থাকতে পারে? ভবিষ্যতে আরও গবেষণা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং মানব বুদ্ধির বিকাশের পথকে আরও পরিষ্কার করতে পারে।



