বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আজ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবছর (২০২৫-২৬) প্রথম ত্রৈমাসিক (জুলাই‑সেপ্টেম্বর) জিডিপি ৪.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হার গত বছরের একই সময়ে নথিভুক্ত ২.৫৮ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মোট উৎপাদনের এই উত্থান মূলত কৃষি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রের শক্তিশালী পারফরম্যান্সের ফলাফল।
শিল্প খাতের বৃদ্ধির হার ৬.৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের ৩.৫৯ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। কারখানার উৎপাদন স্তরে স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি দেখা গেছে, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পে অর্ডার পূরণে ত্বরান্বিত গতি লক্ষ্য করা যায়। এই প্রবণতা দেশের রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা নির্দেশ করে, যদিও পরবর্তী ত্রৈমাসিকে রপ্তানি আয় এখনও স্থিতিশীল নয়।
কৃষি খাত, যা দেশের সর্ববৃহৎ কর্মসংস্থান প্রদানকারী, ২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ধারাবাহিক বন্যা ও বন্যা‑সৃষ্ট ক্ষতির পর এই পুনরুদ্ধার কৃষি উৎপাদনের স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে। ধান, গম ও তেলবীজের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে গ্রামীণ আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সেবা খাতও প্রথম ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এর বৃদ্ধির হার শিল্পের তুলনায় কম। ব্যাংকিং, টেলিকম ও রিটেইল সেক্টরে গ্রাহক চাহিদা বাড়ার ফলে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সেবা খাতের অবদান মোট জিডিপিতে তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)‑এর বিশিষ্ট ফেলো, এই প্রবৃদ্ধিকে “উদ্দীপনামূলক” হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের নিম্ন ভিত্তি থেকে এই বৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তাই বাস্তবিক উন্নয়নের মাত্রা সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা দরকার। বিশেষ করে সেবা খাতের বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা ও কৃষি উৎপাদনের আবহাওয়া নির্ভরতা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রফেসর রহমান আরও বলেন, বর্তমান বৃদ্ধির টেকসইতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রপ্তানি‑মুখী শিল্পের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক পারফরম্যান্স প্রত্যাশিত স্তরে পৌঁছায়নি, যা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, রপ্তানি‑মুখী শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি বৃদ্ধি পায়নি, যদিও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা দেখছেন, শিল্প উৎপাদনের উত্থান দেশীয় চাহিদা বাড়িয়ে তুলবে এবং স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগের প্রবাহকে উত্সাহিত করবে। তবে রপ্তানি‑মুখী সেক্টরের ধীর গতি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও গ্লোবাল চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি বাণিজ্য ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে, ফলে মুদ্রা বাজারে চাপ বাড়তে পারে।
অধিকন্তু, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি পুনরায় শুরু হওয়া উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, তবে রপ্তানি‑মুখী শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহে ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। এই বিষয়টি বিশেষ করে গার্মেন্টস ও জুট শিল্পে স্পষ্ট, যেখানে কাঁচামালের দামের ওঠানামা লাভের মার্জিনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
শ্রম বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বেকারত্বের হার কমাতে সহায়ক। তবে শ্রমিকদের মজুরি ও কাজের শর্তের উন্নয়ন না হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি স্থায়ী নাও হতে পারে। অতএব, শ্রম নীতি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ জরুরি।
সরকারের আর্থিক নীতি এই বৃদ্ধিকে সমর্থন করার জন্য অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। রোড, সেতু ও বিদ্যুৎ গ্রিডের উন্নয়ন শিল্প উৎপাদনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে, রপ্তানি‑মুখী শিল্পের জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা ও রপ্তানি প্রণোদনা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব কৃষি ও রপ্তানি‑মুখী শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই, বৈচিত্র্যপূর্ণ উৎপাদন কাঠামো গঠন ও নতুন বাজার অনুসন্ধান দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
সারসংক্ষেপে, প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক সংকেত দেয়, তবে টেকসই বৃদ্ধি অর্জনের জন্য রপ্তানি‑মুখী শিল্পের পুনরুজ্জীবন, কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি এবং আবহাওয়া‑নির্ভর কৃষি খাতের ঝুঁকি হ্রাসের প্রয়োজন। এই শর্তগুলো পূরণ হলে আগামী ত্রৈমাসিকগুলোতে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবাহ প্রত্যাশা করা যায়।



