বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে পুনরুদ্ধারের সূচনা করেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই‑সেপ্টেম্বর সময়কালে মোট দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) ৪.৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা একই সময়ের পূর্ববছরের ২.৫১ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল শিল্প ও কৃষি খাত। শিল্পখাতে উৎপাদন ৬.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ৩.৫৯ শতাংশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। উৎপাদন বাড়ার ফলে কারখানার কাজের গতি গত বছরের তুলনায় স্পষ্টভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে।
কৃষি, যা দেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থান সরবরাহকারী, ২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে ধারাবাহিক বন্যা ও বন্যা-ফলিত ক্ষতির পর এই উন্নতি কৃষি উৎপাদনের পুনরুদ্ধারকে নির্দেশ করে। সেবা খাতও প্রথম ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এর বৃদ্ধির হার শিল্পের তুলনায় কম।
অর্থনীতিবিদ মুথাফিজুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট গবেষক, এই প্রবণতাকে “উত্সাহজনক” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই উন্নতি গত বছরের নিম্ন ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল, ফলে বৃদ্ধির মাত্রা অতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারে না। সেবা খাতের সম্প্রসারণ সীমিত এবং কৃষি উৎপাদন এখনও বৃষ্টিপাত ও মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
শিল্পখাতে শক্তিশালী পারফরম্যান্সের পরেও রপ্তানি-নির্ভর শিল্পগুলো দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে প্রত্যাশিত ফলাফল দিতে পারেনি। রপ্তানি-উদ্দেশ্যযুক্ত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি বৃদ্ধি পায়নি, যদিও মূলধন যন্ত্রপাতির আমদানি কিছুটা বাড়েছে। এই পরিস্থিতি অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধার এখনও অনিশ্চিত রাখে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, শিল্প উৎপাদনের ত্বরান্বিত গতি শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যেসব কোম্পানি স্থানীয় উৎপাদন ও রপ্তানিতে জোর দিচ্ছে। তবে রপ্তানি-নির্ভর সেক্টরের ধীরগতি এবং কাঁচামাল সরবরাহের ঘাটতি কোম্পানিগুলোর মুনাফা মার্জিনকে চাপ দিতে পারে।
কৃষি খাতে পুনরুদ্ধার বীজ, সার ও কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোর জন্য চাহিদা বাড়াবে বলে আশা করা যায়। তবে বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য অতিবৃষ্টির ঝুঁকি উৎপাদন খরচে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সেবা খাতের বৃদ্ধির গতি যদিও ধীর, তবু তথ্য প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা ও পর্যটন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সেক্টরগুলোতে নীতি সমর্থন ও অবকাঠামো উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক গঠনকে বৈচিত্র্যময় করতে সহায়ক হবে।
সামগ্রিকভাবে, প্রথম ত্রৈমাসিকের ডেটা বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত দেয়, তবে রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের দুর্বলতা ও কৃষি উৎপাদনের মৌসুমী নির্ভরতা ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যাবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত কাঁচামাল আমদানি সহজতর করা, রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং কৃষি বীমা ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, যদি রপ্তানি-উদ্দেশ্যযুক্ত শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহের ঘাটতি অব্যাহত থাকে, তবে জিডিপি বৃদ্ধির হার পরবর্তী ত্রৈমাসিকে ধীর হতে পারে। একই সঙ্গে, বৃষ্টিপাতের অনিয়মিততা কৃষি উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলবে। তাই, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।



