ইরানের নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে যে দেশের দক্ষিণ‑পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাহেদানে, সরকারবিরোধী প্রতিবাদ চলাকালীন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যকে আটক করেছে। গ্রেফতারকৃতরা পূর্ব সীমান্ত থেকে প্রবেশ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উৎপাদিত অস্ত্র ও বিস্ফোরক বহন করছিল, যা ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসাত্মক কাজের পরিকল্পনা করছিল।
ইরানের সামরিক প্রধান আবদোলরহিম মুসাভি এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, উভয় দেশ ইরানের অভ্যন্তরে সশস্ত্র গোষ্ঠী আইএসের (ইসলামিক স্টেট) সদস্যদের পাঠিয়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। মুসাভি আরও উল্লেখ করেন, এই গোষ্ঠীটি ইরানের পূর্ব সীমান্ত অতিক্রম করে, আধুনিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে।
মুসাভি তাসনিমের মাধ্যমে জানিয়েছেন, গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ১২ দিনের সামরিক সংঘাতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার পর উভয় দেশ নতুন কৌশল গ্রহণ করে, যা এখন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত আক্রমণ চালানোর দিকে মোড় নেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান তার সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করলে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশে ইতিমধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক অবিশ্বাস, পাশাপাশি ইসরায়েলের ইরানীয় পারমাণবিক কার্যক্রমের প্রতি সন্দেহ, এই ধরণের গোপনীয় সশস্ত্র অপারেশনকে উস্কে দিতে পারে। সাম্প্রতিক মাসে ইরান-ইসরায়েল সীমান্তে বোমা বিস্ফোরণ, ড্রোন আক্রমণ এবং সাইবার হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাড়ছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, জাহেদানে গ্রেফতারকৃত গোষ্ঠীর অস্ত্রের উৎস যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েরই হতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যে গোপনীয় অস্ত্র সরবরাহের জটিল নেটওয়ার্ককে নির্দেশ করে। তিনি বলেন, এই ধরনের সরাসরি বা পরোক্ষ সহায়তা ইরানের নিরাপত্তা নীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া উত্পন্ন করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই ঘটনার পর কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার নিরাপত্তা উদ্বেগের সমর্থন চায় এবং কোনো দেশকে তার ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপের অনুমতি দেবে না।
ইসরায়েলি কূটনীতিকের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, ইসরায়েল কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগের স্বীকৃতি দেয় না এবং ইরানের অভিযোগকে অস্বীকার করে। তিনি যুক্তি দেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যে এবং কোনো গোপনীয় অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগও একই সময়ে একটি মন্তব্য প্রকাশ করে ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরানের অভ্যন্তরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি কোনো সরকারি নীতি নয় এবং তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এই ঘটনার পর ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী জাহেদান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা জানিয়েছে। অতিরিক্ত গশ্বর, গাড়ি-চেকপয়েন্ট এবং নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর মতে, এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে অনুরূপ আক্রমণ রোধে সহায়ক হবে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও এই ঘটনার দিকে নজর দিচ্ছে। তুর্কি ও আরব দেশগুলো ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে স্বীকৃতি দিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে, ইরান-সৌদি সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থা পারস্পরিক তথ্য শেয়ারিং বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, ইরান এই ধরনের সশস্ত্র হুমকির মোকাবেলায় তার প্রতিরক্ষা ক্ষমতা শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থান রক্ষা করতে কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করবে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার সূচি নির্ধারিত হতে পারে, যেখানে নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে গোপনীয় সংলাপের সম্ভাবনা বাড়তে পারে, যাতে উভয় পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ সমাধান হয়।
সারসংক্ষেপে, জাহেদানে ইসরায়েল-সংযুক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর গ্রেফতার ইরানকে তার ভূখণ্ডের নিরাপত্তা রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের অভিযোগ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে, এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা প্রত্যাশিত।



