ওয়াশিংটন – যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গতকাল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে তৎক্ষণাৎ সামরিক হস্তক্ষেপ না করার জন্য সতর্ক করেন। এই পরামর্শটি দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী প্রতিবাদ এবং তেহরানের কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে আসে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের প্রকাশ্য সমর্থন সত্ত্বেও, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখনো সরাসরি আক্রমণকে বিরত রাখতে চান।
ইরানে গত দুই সপ্তাহে বিশাল পরিসরে প্রতিবাদ চলেছে, যেখানে নাগরিক ও ছাত্ররা সরকারী নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে। প্রতিবাদে সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর হিংস্র দমন দেখা গেছে, ফলে বহু নিহত ও আহত হয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসন এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে ইরানের মানবাধিকার রেকর্ডের সমালোচনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাহলেও তেহরানের সরকার এই সমর্থনকে স্বাগত জানায়নি; তারা যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যকে হস্তক্ষেপের রূপে দেখছে এবং প্রতিবাদ দমনকে স্বতন্ত্র জাতীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে। তেহরানের মুখপাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভ্যান্স এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ইরানে তৎক্ষণাৎ সামরিক পদক্ষেপ না করার জন্য পরামর্শ দেন। তারা উল্লেখ করেন যে, হঠাৎ আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ঘটাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই পরামর্শটি সোমবারই প্রকাশিত হয়, যখন ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক সমঝোতার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতের পেছনে ইরান থেকে পারমাণবিক চুক্তির পুনরায় আলোচনার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা যায়। তিনি দাবি করেন যে ইরান তার পারমাণবিক প্রোগ্রাম নিয়ে নতুন আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য একটি সুযোগ হতে পারে। তবে ভ্যান্সের পরামর্শের সঙ্গে এই দাবির মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ দেখা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই বিষয়ে মতবিরোধ তীব্র। কিছু উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা দ্রুত পদক্ষেপের পক্ষে সরে দাঁড়িয়েছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক দপ্তর দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে। ভ্যান্সের মতামত এই দ্বিমতকে সাময়িকভাবে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে, যাতে হঠাৎ আক্রমণ থেকে উদ্ভূত অপ্রত্যাশিত পরিণতি এড়ানো যায়।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বা সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা ইতিমধ্যে তেহরানের নিরাপত্তা নীতি কঠোর করে তুলেছে। তেহরানের নিরাপত্তা মন্ত্রীর মতে, কোনো বিদেশি শক্তি যদি ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, তবে তা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থিতিশীল করতে পারে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরানের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং তেহরানের প্রতিক্রিয়া উভয়ই ইরান-ইস্রায়েল সম্পর্ক, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গলফ অঞ্চলের সামরিক উপস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তা অঞ্চলের অন্যান্য শক্তিগুলোর সঙ্গে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।
ভ্যান্সের পরামর্শের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। পরবর্তী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দল ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের পরিকল্পনা করছে, যাতে পারমাণবিক চুক্তি ও মানবাধিকার বিষয়ক আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই নীতি পরিবর্তন ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও পরবর্তী নির্বাচনী কৌশলেও প্রভাব ফেলতে পারে। শেষ পর্যন্ত, ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ না করা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সুনাম রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



